আটক ব্যেক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হলে বা নির্যাতনে মারা গেছে মর্মে মেডিকেল প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিচারিক আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন। মামলার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
ফৌজদারি কার্যবিধির বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার (৫৪ ধারা) ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ধারা (১৬৭ ধারা) প্রয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক রায়ে এমন নির্দেশনা এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ৩৯৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। রায়ে ৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা করে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ১০ দফা এবং হাকিম, বিচারক ও ট্রাইব্যুনালের জন্য ৯ দফা গাইডলাইন রয়েছে।
রায় অনুসারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তাৎক্ষণিক একটি মেমোরেন্ডাম (স্মারক) তৈরি করবেন। ওই কর্মকর্তা অবশ্যই গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সই গ্রহণ করবেন, যেখানে তারিখ ও গ্রেপ্তারের সময় উল্লেখ থাকবে।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি বিচারপতি, ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি কিছু নির্দেশনা রয়েছে। আসামিদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা যাবে সে নির্দেশনাও এসেছে। তিনি বলেন, গাইডলাইনে প্রথমেই বলা হয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় যাঁরা আছেন, তাঁরা যেন অতি উচ্চমানের দায়দায়িত্ব পালন করেন। সে বিষয়ে যথাযথ সক্ষমতা তাঁদের দেখাতে হবে। যাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে তাঁর ক্ষেত্রে যেন মানবাধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। যে আসামিকে ধরা হবে তাঁকে যেন নির্যাতন বা হেয়প্রতিপন্ন করা না হয়।
৫৪ ও ১৬৭ ধারা নিয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট এই রায় দেন।
এই বিষয়ে ব্লাস্টের পরিচালক ও আইন উপদেষ্টা এস এম রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, রায়ে দুটি নতুন দিক রয়েছে। আগে দরখাস্ত দিয়ে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হতো। এখন কাউকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখাতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতের সামনে হাজির করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে হবে। এ ছাড়া যদি হাকিমের কাছে প্রতীয়মান হয়, আটক ব্যক্তি পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বা নির্যাতিত হয়ে মারা গেছেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হেফাজতে নির্যাতন নিবারণ আইন অনুসারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন আদালত।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ১৮ বছর আগে ১৯৯৮ সালে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে শামীম রেজা রুবেল নামে এক ছাত্রকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর ওই বছরের ২৩ জুলাই মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে রুবেলের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তদন্ত শেষে কমিটি ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের পক্ষে কয়েকটি সুপারিশ করে। সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে ব্লাস্ট। ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল হাইকোর্ট এ বিষয়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন। রায়ে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে প্রচলিত বিধি ছয় মাসের মধ্যে সংশোধন এবং ওই ধারা সংশোধনের আগে কয়েক দফা নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে ২০০৪ সালে। রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে গত ২৪ মে রায় দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ। গতকাল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।
আরও পড়ুন: