বর্ণবাদের বেড়াজালে নিষ্পেষিত ফ্লয়েডের জীবন

সীমাবদ্ধতার দেয়াল; শুনলেই আঁতকে উঠি! আমাদের এ সমাজে আমরা নিজেরাই বিভাজনের দেয়াল গড়ে তুলি। হোক সেটা সুন্দর কোনো মুহূর্তে কিংবা কোনো এক কঠিন সময়ের আবর্তনে। সৃষ্টির বিলাসিতার মধ্যেই নগ্ন জীবনের পদধ্বনির আভাস আমাদের দিয়ে যায়। এ ঘৃণিত বিভাজন সমাজকে প্রোথিত করে এক কারান্তরিত সমাজের অঙ্গরূপে। বিভাজনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে নিজেকে সীমাবদ্ধতার দেয়ালে আটকে রাখি। কখনো ফিরে দেখতে পাই না বিদগ্ধ জাতির নিষ্প্রভ চেহারা। আবার নিজেরাই সেই বিভেদটুকু ভাঙার চেষ্টা করি। সেই বিভেদের মধ্যেই জেগে থাকে মতানৈক্য, যা থেকে শুরু হয় বর্ণবৈষম্য।

সমাজের এ বিভাজন হতে পারে গায়ের রঙের ওপর নির্ভর করে, আঞ্চলিকতায় নির্ভর, কিংবা বর্ণের (Cast) ওপর ভিত্তি করে। আবার, কখনো এক জাতির প্রতি অন্য জাতির বিদ্বেষমূলক মনোভাবহেতু তৈরি হয়ে থাকে। ফলে সীমাবদ্ধতার মধ্যে আরও সীমাবদ্ধতা বেড়ে যায়। মানবজাতির ইতিহাসে বর্ণবৈষম্যের গ্লানি বারবার মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে।

কখনোবা সমাজে নিষ্পেষিত হয়ে, কখনো বা শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়ে। তাতে নেমে আসে ভয়াবহ অন্ধকার। মনোবল ভেঙে মেনে নিতে হয় নিষ্পেষিত জীবন। এভাবেই চলে তাদের জীবনসংগ্রামে ব্রতী হওয়ার বাসনা।
সমগ্র পৃথিবীতে বর্ণবাদের অস্তিত্ব কম বেশি পরিলক্ষিত হয়। যদিও আফ্রিকায় বর্ণবাদ শুধু মানুষের গায়ের রঙের ওপরই নির্ভর করত। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকায় (বর্তমান নামিবিয়া) কয়েক দশক ধরে চলা বর্ণবাদ প্রকৃতপক্ষে জাতিগত বিভাজনের একটি নিদর্শন। শ্বেতাঙ্গশাসিত সরকার সে দেশে একটি আইন তৈরি করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।

আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ওপর ইউরোপ থেকে আসা শ্বেতাঙ্গ মানুষ দ্বারা বৈষম্যের শিকার হলে সেখানেই প্রথম প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। ১৯৬০ সালে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে পুলিশ তাদের ওপর নির্বিচার গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমাতে চেষ্টা করে। দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালে কারারুদ্ধও করা হয়। সেখানে নিপীড়িত ভারতীয় সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী আন্দোলন করেন। সে জন্য তাঁকেও সেখানে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল।

এরপর বর্ণপ্রথা দক্ষিণ আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে জাতিগত, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা সম্প্রদায়ভিত্তিক বর্ণবাদে জড়িয়ে পড়ে অনেক দেশ। আমেরিকা বা ইউরোপে কালোদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা, জার্মানির হিটলার কর্তৃক ইহুদি নিধন যা হলোকাস্ট নামে পরিচিত। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ যা অ্যাপার্থেড নামে পরিচিত।

দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদের সংস্কৃতি থেকে আমেরিকা এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। সিভিল রাইটস প্রতিষ্ঠার আগে সেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার ছিল না। মার্টিন লুথার কিংয়ের হাত ধরেই কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। যদিও জর্জ ওয়াশিংটন কিংবা জেফারসনের মতো শ্রেষ্ঠতর ব্যক্তিরা এ বিষয়ে চিন্তাই করেননি।

তথাকথিত জিম ক্রু আইনের অধীনে আফ্রো আমেরিকানদের সামাজিক আধিকার ছিল খুবই সীমাবদ্ধ৷ যেমন শ্বেতাঙ্গ ব্যবহৃত স্কুল, গির্জা বা সাধারণ প্রতিষ্ঠানসমূহে তাঁদের প্রবেশাধিকার ছিল না৷ বর্ণবাদের বিষবাষ্পে নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, নির্যাতিত কালো মানুষেরা ক্ষুব্ধ হয়েই যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র তথা অন্য দেশেও বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদের ঝড় নেমে আসে। মানুষের প্রতি মানুষের বীতশ্রদ্ধ মনোভাব শেষ পর্যায়ে হয়তো নেমে আসে বিক্ষুব্ধতার স্ফুরণে। যেটা লক্ষ করতে পারি সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনায়।

২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার মিনিয়াপোলিস শহরে জাল নোটের অভিযোগে পুলিশ জর্জ ফ্লয়েডকে আটক করে। জর্জ ফ্লয়েডকে হাঁটু দিয়ে গলা চিপে হত্যা করে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ। কাতরাতে কাতরাতে কালো জর্জ ফ্লয়েড মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ভিডিওটি দেখতে পাওয়া যায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। একটিমাত্র ভিডিও ক্লিপে আন্দোলন বেগবান হয়ে আসে। কী এমন ঘটনা ঘটেছিল সেখানে? পুলিশ ফ্লয়েডকে সজোরে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরেছিল, ফ্লয়েড বাঁচতে চেয়েছিল। বাঁচার আকুতির জন্যই বলেছিল, ‘আমি মরে যাচ্ছি, আমি শ্বাস নিতে পারছি না’! কিন্তু পুলিশ তাকে বাঁচতে দিল না। জানা গেল, বর্ণবিদ্বেষের দরুন তাঁকে হত্যা করা হয়। এহেন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় চারজন পুলিশকে চাকরিচ্যুত করা হয়। প্রথম দিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সেটি করতে পারেনি। বর্ণবিদ্বেষী হিসেবে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবাদমুখর মানুষ সেখানে আন্দোলন করেছে। বর্তমানে করোনার এই সংকটকালীন মুহূর্তেও মানুষ জড়ো হয়ে প্রতিবাদ করছে।

সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই গণ-আন্দোলনের পর মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রে এটাই বড় আন্দোলন, যা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন। আন্দোলনে বিশ্বের অনেক দেশ একাত্মতা ঘোষণা করে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিক্ষোভের প্রতি সহিংস প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যর ট্রাফালগার স্কয়ারেও অনেক মানুষ জড়ো হয়ে স্লোগানমুখরে প্রতিবাদ করছে। এ ছাড়া কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডেও এ ন্যক্কারজনক ঘটনার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, এ প্রতিবাদমুখর আন্দোলনে শুধু কালো চামড়াধারীরাই নয়, শ্বেতাঙ্গরাও আন্দোলনে সমর্থন জুগিয়েছে।

যে দেশে মার্টিন লুথার কিংয়ের জন্ম, সেখানে আজ এমন ঘৃণিত অবস্থা। তিনি তো সে দেশে বসেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। বলে গিয়েছিলেন স্বপ্নের কথা। প্রতিবাদের অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অহিংসাকে। সেখানে দেখতে পাই কৃষ্ণাঙ্গদের আর্তনাদ। আহাজারিতে প্রকম্পিত হয়ে আসে বায়ু।

যুগ যুগ ধরে এভাবে শুধু আমেরিকায় নয় আমাদের পুরো সমাজে বর্ণবাদের শিকড় প্রোথিত হয়ে আছে। বর্ণবৈষম্যের আচরণে বিক্ষুব্ধ জাতির কান্না কয়জনেই–বা খোঁজে ফিরে। মনুষ্যত্বের মধ্যে জেগে থাকা মানবতার স্পর্শে আমরা সমাজকে জাগাতে অসমর্থ হয়ে ব্যর্থতার ধ্বনি শুনতে পাই। যেখানে একটি সমাজের অংশকে শিকলের বন্ধনে আবদ্ধ রেখে পদস্খলন করতে চায়, সেখানে রূঢ়তাকেও হার মানিয়ে ধরা পড়ে সমাজের নগ্ন চিত্র। সমাজের এ নগ্ন চিত্রকে প্রোত্থিত করে রেখেছে আমাদের সমাজেরই কোনো এক গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়।

সুন্দর এ পৃথিবীতে যখন অসুন্দরের আভাস দেখা দেয় আমাদের তখন প্রাণে স্পন্দন ফিরে আসে না। ভেবে নিলাম, আমাদের এ রূঢ়তা কোনো এক কালে হয়তো ঢেকে যাবে। কিন্তু ঘৃণিত মানবসমাজের উত্থান কখন থেমে আসবে। তাদের এ কালো থাবা থেকে কখন নিষ্পেষিত সমাজ রক্ষা পাবে। নাকি চলতে থাকবে বর্ণবাদের চিরাচরিত রূপ।

সৃষ্টির আদি থেকেই মানুষ তথা সমাজের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজমান। সে দ্বন্দ্ব হোক বর্ণবাদী আচরণে কিংবা সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে। হয়তোবা কোনো এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। সীমাবদ্ধতার মধ্যে এ বিভাজনে আমরাই মেতে উঠি। প্রতিটি সমাজের রন্ধ্রেই এভাবে তাড়া করে বেড়ায় উগ্রতার নগ্নরূপ। তাদের প্রতি এমন অসাম্য মনোভাব দেখা যেত না যদি সমাজে সরসভাবে জেগে থাকা মানুষগুলো অনুভব করতে পারত বর্ণবাদের বিরূপ প্রতিধ্বনি। দেখতে পেত বর্ণবাদের শোষিত জীবন।

তবে এ অসাম্যের মানবসমাজকে বর্ণবাদীর গণ্ডি থেকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টায় দেখতে পাই সংহতির পদলেহন। আবার কখনো বা দু–চার কলম লেখালেখিতে মত্ত থেকে আড়ষ্ট সমাজকে জাগ্রত করার প্রয়াসে লিপ্ত থেকে আমরা খুঁজে ফিরি আত্মিক বন্ধনের সুষ্ঠু সমাজ।

* ব্যাংকার ও লেখক।