
জিপিএ ৫ পেয়েছে তারা চারজনই। এই অর্জনের আনন্দ সীমাহীন। তবে তার আড়ালে রয়েছে একেকটি কষ্টের কাহিনি। কারণ, এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করার পথটা তাদের জন্য অন্যদের চেয়ে অনেক কঠিন ছিল।
গৌরবময় অর্জনকে পুঁজি করে জীবনের পথে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে চায় বিরামপুরের দিশা খাতুন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাদিম মাহমুদ, কলাপাড়ার তৃষ্ণা রানী কির্তনীয়া ও তারাগঞ্জের সোহাগ সরকার। তারা মা-বাবার মুখে আরও হাসি ফোটাতে চায়। মানুষের মতো মানুষ হতে চায়।
সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায় দিশা: দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার দিশা খাতুনের জন্মের আগেই তার বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান। স্বামীর অকালমৃত্যুতে দুই ছেলে আর গর্ভের শিশুকে নিয়ে দিশাহীন হয়ে পড়লেন দিলজান বেগম। অভাব-অনটনের সংসারে এল নতুন অতিথি। জীবিকার তাগিদে দিলজান শুরু করলেন শীত মৌসুমে পিঠা বিক্রির কাজ। দুই ছেলের লেখাপড়া তখন বন্ধ। তবু মনে মনে কিছু স্বপ্ন দেখছিলেন বলেই হয়তো মেয়ের নাম রাখলেন দিশা। নামের সার্থকতা প্রমাণ করে মায়ের জীবনকে দিশা দিয়েছে সে।
বিরামপুর পৌর শহরের ইসলামপাড়া মহল্লায় টিনের ছাপড়া দেওয়া ভাঙাচোরা মাটির ঘর দিশা খাতুন ও দিলজান বেগমের। সেখানে বসেই দিলজান গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে দিশার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন আদর্শ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান। দিশার ভাষ্য, শ্রেণিপাঠের পাশাপাশি নিয়মিত বাড়তি পড়াশোনা করেছে সে। পরীক্ষা ও পাঠের ব্যাপারে শিক্ষকেরা আলাদা করে তার যত্ন নিয়েছেন। তাই ভালো ফলাফল করতে পেরেছে সে। সুবিধাবঞ্চিত কোনো শিশুই যেন লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত না হয়, এ জন্যই সে শিক্ষকতার পেশা বেছে নিতে চায়।
বিরামপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জিন্নাহ্ প্রথম আলোকে বলেন, দিশার শিক্ষাজীবন যেন এখানে থেমে না যায়, সে জন্য উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বিনা মূল্যে লেখাপড়া করার সব ব্যবস্থা তিনি করবেন।
‘মানুষ’ হতে চায় নাদিম: বাবা রিকশাচালক। দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার কারণে কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন না। আয় সারা দিনে এক থেকে দেড় শ টাকার বেশি নয়। তা-ও অনিয়মিত। এই আয়ে চারজনের পরিবারে ক্ষুধা মিটিয়ে লেখাপড়ার খরচ জোগানো যে সম্ভব নয়, সেটা বুঝতে পারে নাদিম মাহমুদ সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই। তাই লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে রাজমিস্ত্রির জোগালির কাজ শুরু করে। উপার্জনের পুরো টাকাই তুলে দেয় মায়ের হাতে। এভাবেই লেখাপড়াটা চালিয়ে সাফল্য হাতের মুঠোয় পুরেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার হরিপুর মিয়াপাড়ার আবদুল বারীর ছেলে নাদিম মাহমুদ। সে এবার রাজারামপুর হামিদুল্লাহ উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলাফল শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাননি মা-বাবা। পরে নিশ্চিত হয়ে আনন্দে মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। বাবার চোখ ভিজে ওঠে। নাদিম বলে, তার লক্ষ্য জীবনে ভালো একটা অবস্থানে পৌঁছানো এবং মা-বাবার মুখের হাসি অটুট রাখা। মানুষের মতো মানুষ হতে চায় সে।
পড়ার খরচ নিজেই জুগিয়েছে তৃষ্ণা: ‘টিউশনি কইর্যা যা পাইতাম, হেইয়া দিয়া পড়ার খরচটা সামাল দেতাম’—এ কথা চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়া তৃষ্ণা রানী কির্তনীয়ার। তার বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নবাবগঞ্জ গ্রামে। বাবা শ্রীবাস কির্তনীয়া কলাপাড়া পৌর শহরের একটি মিষ্টির দোকানের কর্মচারী। দৈনিক ১০০ টাকা বেতনে কাজ করেন। আর তৃষ্ণার মা কল্পনা রানী কির্তনীয়া বাড়িতে বসে হেলি পাতা দিয়ে ‘হোগলা’ বোনার কাজ করেন। মাসে ২০-২৫টি হোগলা বুনে তা বিক্রি করেন। এককথায় বলতে গেলে বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কোনোমতে চলছে তৃষ্ণাদের পরিবার।
তৃষ্ণা প্রথম আলোকে বলে, ‘পেরতেক দিন ছয় কিলোমিটার পথ হাঁটা, তারপর খেওয়া পার অইয়া স্কুলে যাইতে অইত। স্কুল আর বাড়ি মিলাইয়া ১২ কিলোমিটার পথ হাঁটতাম।’
তৃষ্ণার বাবা শ্রীবাস বলেন, ‘কীরহম পাস করছে, হ্যা কইতে পারমু না। তয় হুনছি সব বিষয়ে আশির উপারে নাম্বার পাইছে। ভালো পাস করছে। সামনে মোর এই মাইয়াডার পড়ার খরচ ক্যামনে চলবে, হেই চিন্তায়ই পইড়্যা গ্যাছি।’
খেপুপাড়া বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ও কতটা মেধাবী তা ফলাফলে প্রমাণ করে দিয়েছে। তৃষ্ণা হচ্ছে আমাদের সমাজের আলো। আমি বলব সে দারিদ্র্যকে জয় করেছে।’
দিনমজুরি করে পড়া চালিয়েছে সোহাগ: ১৬ বছর আগে বাবার মৃত্যু হয়। মায়ের উপার্জনে সংসারের চাকা ঠিকমতো চলছিল না। বাধ্য হয়েই সপ্তাহে দুই দিন স্কুল কামাই করে অন্যের খেতে ধান কাটা, নিড়ানি দেওয়া ইত্যাদি কাজে লেগে পড়ত সোহাগ সরকার। বন্ধুদের কাছ থেকে নেওয়া পুরোনো পোশাক গায়ে চড়িয়েছে। বহুদিন অভুক্ত থেকেও চালিয়ে গেছে পড়াশোনা। বরাতি উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিল সে। চার ভাইবোনের মধ্যে মেজো সোহাগের বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সরকারপাড়া গ্রামে। বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘরে একটি টিনের ঘরে এক পাশে বর্গা নেওয়া ছাগল-গাভি থাকে, অন্য পাশে তারা। বিদ্যুৎ নেই, কুপির আলোয় চলে লেখাপড়া।
সোহাগের মা সাহিদা বেগম বলেন, ‘প্যাটোত ভাত জোগাড় করবার পরি না। ছাওয়াকটাকা পড়ামো ক্যামন করি।’
প্রধান শিক্ষক সেকেন্দার আলী বলেন, সোহাগের কাছে বেতন, ফরম পূরণের টাকা নেওয়া হয়নি। সপ্তাহে দুই দিন বিদ্যালয়ে না এসেও ভালো ফল করে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে সে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং তারাগঞ্জ (রংপুর), বিরামপুর (দিনাজপুর) ও কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি।