
জন্ম যুক্তরাজ্যের লুটনে, এক বাংলাদেশি পরিবারে। নাগরিকত্বে ব্রিটিশ। পড়াশোনা, বেড়ে ওঠাও ব্রিটিশ সমাজে। আবার মাথায় হিজাব দেখে সহজেই বোঝা যায়, তিনি একজন মুসলিম নারী। এমন মিশ্র পরিচয়ের নাদিয়া হোসেনের কাছে কোন পরিচয়টি সবচেয়ে বড়?
নাদিয়ার সোজাসাপ্টা জবাব, খাঁটি ব্রিটিশ, খাঁটি বাংলাদেশি কিংবা খাঁটি মুসলিম বলে কিছু নেই। সব কটি পরিচয়ই তাঁর ক্ষেত্রে বাস্তব। তিনি বলেন, ‘আমার যে বাংলাদেশি পরিচয়, বাংলাদেশের সঙ্গে যে শিকড়ের বন্ধন, সেটিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
গতকাল বুধবার সেন্ট্রাল লন্ডনের এশিয়া হাউসের আয়োজনে অনুষ্ঠিত আলাপচারিতা অনুষ্ঠানে ‘দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ শিরোপাজয়ী নাদিয়া হোসেন এসব কথা বলেন। এশিয়া হাউসের সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য উৎসবের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠানের।
‘ইয়াসমিন আলিভাই-ব্রাউনের সঙ্গে নাদিয়া হোসেনের কথোপকথন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে নাদিয়া তাঁর গৃহকর্ত্রী থেকে সেলিব্রিটি হয়ে ওঠার গল্প শোনান। সাংবাদিক, কলাম লেখক ও লেখিকা ইয়াসমিন আলিভাই-ব্রাউন উগান্ডান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ। এই দুজনের কথোপকথনে উঠে আসে যুক্তরাজ্যে অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের আত্মপরিচয় নিয়ে টানাপোড়েনের নানা চিত্র।
গত বছর বিবিসির জনপ্রিয় রান্নাবিষয়ক প্রতিযোগিতা ব্রিটিশ বেক অফ শিরোপা জিতে সেলিব্রিটি বনে যান নাদিয়া। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের রানির জন্মদিনের কেক বানিয়ে আবারও সাড়া ফেলে দেন তিনি। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিনে লেখালেখি করছেন। আর নিয়মিত সরব টিভি পর্দায়।
নাদিয়া বলেন, ব্রিটিশ বেক অফ শিরোপা জয়ের পর তাঁকে এবং তাঁর স্বামীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোকজনের অনেক নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয়েছে। নাদিয়া বলেন, ‘মুসলিম নারী হয়ে কী করে টিভির পর্দায় হাজির হলাম, এ নিয়ে নানা সমালোচনা শুনতে হয়েছে। পরপুরুষের সঙ্গে আমি টিভি অনুষ্ঠানে গিয়েছি বলে কেউ কেউ আমার স্বামীর প্রতি বিদ্রূপ বাক্য উচ্চারণ করেছেন। আমাকে মুসলিম এবং বাংলাদেশি বলে নানা বিদ্রূপ করা হয়েছে। রানির জন্মদিনের কেক বানানোর আগে যাতে হাত ধুয়ে নিই-এমন পরামর্শও আমাকে শুনতে হয়েছে।’ প্রথম প্রথম এমন মন্তব্যে ভেঙে পড়তেন জানিয়ে নাদিয়া বলেন, ‘পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে ভেবেছি, লোকদের বাজে মন্তব্যে আমি দমে যেতে পারি না। ভালো কিছু করার অধিকার নিশ্চয়ই আমার আছে।’
ইয়াসমিন আলিভাইও একই রকম অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, অভিবাসী বাবা-মায়েরা তাঁদের সন্তানদের কোনো প্রতিযোগিতামূলক কিছুতে দিতে চান না। কারণ, তাঁদের আশঙ্কা থাকে, সন্তান বৈষম্য কিংবা বাজে মন্তব্যের শিকার হয়ে কষ্ট পাবে। ইয়াসমিন বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের নিয়ে যখন নানা নেতিবাচক কথাবার্তা, তখন নাদিয়া যেন সেসবের দাঁতভাঙা জবাব হয়ে আবির্ভূত হলেন। এ দেশে মুসলিম রাজনীতিকেরা বা সরকারি নীতি মুসলিমদের অগ্রযাত্রায় যা করেনি, নাদিয়া হোসেন ব্রিটিশ বেক অফ জিতে তার চেয়ে বেশি করেছেন।’
নাদিয়া বলেন, তাঁর বাবা জমির আলী ছিলেন রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি (শেফ)। গৃহিণী মা আসমা বেগম বাসার রান্নাবান্না করতেন। তাঁদের সন্তান হিসেবে রান্নার বিষয়টি তাঁর কাছে নতুন কিছু ছিল না। তবে স্কুলের রান্নার ক্লাসে তাঁর কেক বানানোর হাতেখড়ি।
নাদিয়া বলেন, ‘১৯ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই আমি বাংলাদেশে বেড়াতে যেতাম। ২০ বছর বয়সে বাংলাদেশেই তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। বিয়ের পর আমি নিজেও ছিলাম একজন পাকা গৃহিণী। কিন্তু স্বামী আবদাল হোসেন আমাকে বিবিসির ওই অনুষ্ঠানে নাম লেখাতে উৎসাহিত করেন। ওই অনুষ্ঠানের দীর্ঘ ছয় মাসের প্রক্রিয়ায় স্বামীই আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। আমার বাবা-মা বিষয়টি জানতে পারেন কেবল চূড়ান্ত পর্বের আগে।’ নাদিয়া বলেন, ‘শোনার পর বাবা প্রথমেই জানতে চাইলেন, আমি জিতলে কত অর্থ পুরস্কার পাব। যখন বললাম, কোনো অর্থ দেওয়া হবে না, তখন বাবা বললেন, তাহলে আর এটা করে লাভ কী?’
তিন সন্তানের জননী থেকে হঠাৎ করে সেলিব্রিটি বনে যাওয়ার বিষয়টি সব নারীর জন্য এক বিশেষ অনুপ্রেরণার বলে জানান অনুষ্ঠানে উপস্থিত নারী দর্শকেরা।
এক প্রশ্নের জবাবে নাদিয়া বলেন, তিনি অবশ্যই চান তাঁর সন্তানেরা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানুক এবং তাঁরা নিজ থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ আগ্রহী।
সপ্তাহ দুয়েক আগে বিবিসির একটি অনুষ্ঠানের শুটিং করার জন্য বাংলাদেশে গিয়েছিলেন জানিয়ে নাদিয়া বলেন, বিয়ানীবাজারের মোহাম্মদপুর গ্রামে তাঁর দাদার বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আছেন। সেখানেই তিনি বিবিসির বিশেষ রান্নাবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রের জন্য শুটিং করেছেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে নাদিয়া বলেন, তাঁর পরিবারের লোকজন এখনো বাংলাদেশে চাষাবাদ করেন। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব, তাঁর সরাসরি ভুক্তভোগী তাঁর পরিবারও। ফসলের ক্ষতি হলে যুক্তরাজ্য থেকে অর্থ পাঠিয়ে সেই ক্ষতি পোষাতে হয়।
নাদিয়া বলেন, পশ্চিমা দেশে বেশির ভাগ লোক জলবায়ু পরিবর্তন বলতে হয়তো বোঝেন, ‘ওহ্! এবার বোধ হয় গরম একটু বেশি পড়বে বা শীত একটু আগে আসবে। কিন্তু মানুষের জীবন-জীবিকায় এর যে প্রভাব, সেটা তাঁরা টের পান না।’