যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে ব্যবসার বড় সমস্যা ঘুষ ও সাংঘর্ষিক রাজনীতি

যুক্তরাজ্য বলেছে, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার সবচেয়ে বড় সমস্যা সাংঘর্ষিক রাজনীতি, ঘুষ ও দুর্নীতি। এ ছাড়া রাজনীতিবিদ, আমলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বৈষম্যমূলক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। তবে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘুষ-দুর্নীতির পাশাপাশি অবকাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঝুঁকি সম্পর্কে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে সে দেশের সরকার। ‘বৈদেশিক বাণিজ্য ঝুঁকি: বাংলাদেশ’ (ওভারসিজ বিজনেস রিস্ক: বাংলাদেশ) শীর্ষক এই নির্দেশনামূলক প্রতিবেদনটি গত বুধবার যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। তাতে রাজনীতি ও অর্থনীতি, মানবাধিকার, ঘুষ ও দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ, প্রতিরক্ষামূলক নিরাপত্তা উপদেশ, মেধাস্বত্ব এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ—এই সাতটি উপশিরোনামে ঝুঁকিগুলো বর্ণনা করা হয়।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী প্রতিবেদনটির বক্তব্য প্রসঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, অবকাঠামো সমস্যার সমাধান একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু ব্যবসার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঘুষ, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বাধা দূর করতে দরকার শুধু সদিচ্ছা ও যথাযথ উদ্যোগ। সেই সদিচ্ছা ও উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে।
রূপালী চৌধুরী মনে করেন, সরকার বছর বছর করসহ বিনিয়োগসংক্রান্ত আইন-কানুনে যেসব পরিবর্তন আনে, সেগুলো বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। কারণ বিদেশিরা বিনিয়োগের আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। তাই বছর বছর আইন-কানুন ও কর-সংক্রান্ত বিষয় পরিবর্তন করা হলে তা বিদেশি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বাধা তৈরি করে।
বাংলাদেশকে একটি সংসদীয় গণতন্ত্র ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশ হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য সরকারের তৈরি করা ওই নির্দেশনায় বলা হয়, দেশটির রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আধিপত্যনির্ভর। আর এ দুটি দলের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক। আবার দল দুটির রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সাংঘর্ষিক ও অতি কেন্দ্রীভূত।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাস রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায়িক খাতে বড় ক্ষতি হয়েছে। তবে এরপরও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী। ১৫ বছর ধরে ৫ থেকে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা দেশটি চলতি বছরও ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে আশা করছে।
দুর্নীতিকে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে অন্যতম বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয় উল্লেখ করে নির্দেশনায় বলা হয়, বাংলাদেশে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও দাতা সংস্থাগুলোর অব্যাহত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ঘুষ ও দুর্নীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেকাংশে জেঁকে বসেছে। ঘুষ ও দুর্নীতি রোধের সরকারি প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। প্রক্রিয়াগুলো আমলাতান্ত্রিক বাড়াবাড়ির দোষে দুষ্ট।
সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি সম্পর্কে বলা হয়, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার বড় কোনো ঘটনা না ঘটলেও দেশটিতে হামলার ঝুঁকি নেই—এমনটি মনে করা যাবে না। ২০০৫ সালের পর থেকে সন্ত্রাস দমনে সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করা হয় প্রতিবেদনে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো বড় উদ্বেগের বলে এতে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশ মানবাধিকার-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনের বেশ কয়েকটি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ আইনের প্রয়োগ বেশ দুর্বল। ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা এবং শিশু শ্রমের মতো বিষয়ে চরম উদ্বেগ বিদ্যমান।
এ ছাড়া বাংলাদেশে পণ্যের নকল করা এবং মেধাস্বত্ব আইনের দুর্বলতার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয় প্রতিবেদনে। বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের তৎপরতা নেই উল্লেখ করে বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বের অনেক শহরের তুলনায় ঢাকা অনেক নিরাপদ। তবে পকেট চুরি, ছিনতাই কিংবা ডাকাতির মতো ঘটনাগুলো সময়ে সময়ে ঘটে থাকে।
বাংলাদেশে বিচার পাওয়ার কাজটি দুরূহ হতে পারে মন্তব্য করে প্রতিবেদনে বলা হয়, আদালতগুলো মামলার ভারে জরাজীর্ণ এবং আইনের প্রয়োগও বেশ দুর্বল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শারীরিক নির্যাতন ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়।