
হেলমুট কুটিন। ৭৯ বছরের এক ‘যুবক’। বিশ্বের ১৩৫টি দেশে দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও যুবাদের কল্যাণে আজীবন কাজ করছেন। ‘হারম্যান মেইনার’–এর আশ্রয়ে পালিত স্নেহধন্য শিষ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী সময়ে হারম্যান মেইনার অনাথ শিশুদের জন্য অস্ট্রিয়ার মানবহিতৈষীদের সহায়তায় গড়ে তুলেছিলেন এসওএস শিশুপল্লি। ১৯৪৯ সালে অস্ট্রিয়ার টাইরল প্রদেশে এর যাত্রা শুরু।
পিছিয়ে পড়া শিশুদের একটি পরিবারে রেখে কীভাবে মাতৃছায়ায় গড়ে তোলা যায়, সেটাই ছিল হারম্যানের ভাবনা, যা পরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বব্যাপী। এসওএসের কার্যক্রম সঞ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশেও, ১৯৭২ সালে। হারম্যান মেইনার তহবিল ও বিশ্বব্যাপী অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তায় বেড়ে উঠেছে এসওএস কিন্ডারডর্ফ ইন্টারন্যাশনাল। ইত্যবসরে হারম্যান মেইনার পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও রেখে গেছেন তাঁর অমর কীর্তি। বিশ্ব পেয়েছে হেলমুট কুটিনের মতো সোনার মানুষ।
১৯৪১ সালে ইতালিতে হেলমুট কুটিনের জন্ম। বেড়ে ওঠা অস্ট্রিয়ার শিশুপল্লিতে। অস্ট্রিয়ার স্বনামধন্য ইন্সব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। ১৯৮৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজ ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বর্তমানে অনারারি প্রেসিডেন্ট। আজও ১৩৫টি দেশে এসওএস শিশু ও যুবপল্লির দেখভাল করে চলেছেন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এই লিভিং লিজেন্ডের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল ‘এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল’–এর বাংলাদেশ ন্যাশনাল অফিসে।
ঢাকার শ্যামলীতে ন্যাশনাল অফিসে কথা হয় হেলমুট কুটিনের সঙ্গে। ৫২ বছর আগে ড. হারম্যানের সঙ্গে ভিয়েতনাম যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। এটা ছিল যুদ্ধের সময়। তাঁরা সেখানে এসওএস শিশুপল্লির কার্যক্রম শুরু করেন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণের সুযোগ ঘটে সে সময়। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হারম্যান মেইনারের সঙ্গে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ আসেন কুটিন। দেখা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। হোটেলগুলো ছিল তখন অতিথিতে পরিপূর্ণ। তাঁরা থেকেছেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। চারজনের থাকার ব্যবস্থা হয় এক রুমে। দেশজুড়ে তখন মা-বাবাহারা অজস্র অনাথ-অসহায় শিশু। কালবিলম্ব না করে তাঁরা বাংলাদেশে একটি শিশুপল্লি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। শ্যামলীর এই জায়গা কিনে নিয়ে ১৯৭২ সালে গড়ে তোলেন বাংলাদেশের প্রথম এসওএস শিশুপল্লি। ঢাকা ছাড়াও বর্তমানে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও সিলেটে এর কার্যক্রম চলমান।
এসওএস শিশুপল্লি, বাংলাদেশ নিয়ে অনেকের মাঝেই এমন একটা গুঞ্জন শোনা যায় যে প্রতিষ্ঠানটি আগের মতো বিদেশি সহযোগিতা পাচ্ছে না। কথাটি কতটুকু সত্য—এমন প্রশ্নে কুটিনের সপ্রতিভ উত্তর ছিল, ‘আমাদের এটা মানতে হবে যে একটি প্রতিষ্ঠান আজীবন বিদেশি সহযোগিতায় চলতে পারে না। প্রতিষ্ঠানকে স্বনির্ভর হতে হবে। প্রয়োজনে স্থানীয় সহযোগিতা নিতে হবে। প্রায় ৫০ বছর যাবৎ এসওএস শিশুপল্লি, বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে ইউরোপীয় উন্নয়ন সহযোগীদের মাধ্যমে। এ দেশের মানুষদের এখন এগিয়ে আসার সময় হয়েছে। এ দেশের দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দায়িত্বটুকু আপনাদেরই বুঝে নিতে হবে। থাইল্যান্ডে এসওএস একসময় সহযোগিতা নিলেও বর্তমানে স্বনির্ভর। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় যথেষ্ট কোমল, বিশেষত শিশুদের জন্য। বাংলাদেশও এই বিষয়ে স্বনির্ভর হতে পারবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। অস্ট্রিয়াতে ৮ মিলিয়ন জনগোষ্ঠী থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের এক মিলিয়ন বন্ধু আছে। বাংলাদেশের মানুষ জনসংখ্যা অনুপাতে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলে এখানেও সেটা সম্ভব। সংবাদমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারসহ অনেক পরিবারে সঙ্গে আমার জানাশোনা। আমাদের কার্যক্ষেত্রে তাঁদের অব্যাহত সহযোগিতা পেয়েছি, ভবিষ্যতেও পাব বলে আশাবাদী।’
এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ, ঢাকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন হেলমুট কুটিন। স্বনির্ভরভাবে ও স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে বেশ কয়েক বছর ধরে কলেজটি পরিচালিত হচ্ছে। দেশে-বিদেশে এই কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তাঁদের নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন যথেষ্ট মজবুত। বিভিন্ন প্রয়োজনে অ্যালামনাইরা একে অপরের পাশে দাঁড়ান নিঃসংকোচে। এখন পর্যন্ত কলেজকেন্দ্রিক অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কোনো কাঠামোগত অবস্থান গড়ে ওঠেনি। তবে তারা চাইলে এই বিষয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। কলেজের নিয়মানুযায়ী এখানকার শিক্ষকেরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের বাসায় আলাদা করে পড়াতে পারেন না। এভাবে অতিরিক্ত উপার্জনের সুযোগ নেই তাঁদের। শিশুপল্লির বিষয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, পল্লির অনেক শিশুই পরবর্তী কর্মজীবনে সফলতা পেয়েছে। আবার অনেকে তেমনটা পায়নি। উন্নত জীবনের জন্য তাদের অনেককেই এখনো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তবে এসওএস শিশুদের মধ্যকার বন্ধন তাদের পরবর্তী কর্মজীবনে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সহায়ক হয়। এসওএস শিশুরা যাতে উন্নত জীবনের সন্ধান পায়, সে ব্যাপারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি এসওএস মায়েদের প্রতিও দায়িত্ব পালনে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই।
১৯৭২ থেকে অদ্যাবধি হেলমুট কুটিন নিবিড়ভাবে বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন। এ সময়ের মাঝে খুব একটা গুণগত পরিবর্তন তাঁর নিকট দৃশ্যমান হয়নি। উত্তরোত্তর এখানে শুধু জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। রাস্তায় বেড়েছে যানবাহন। অসংখ্য সুউচ্চ ভবন ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তিনি কামনা ও প্রার্থনা করেন, বাংলাদেশের জনগণ যাতে এই উন্নতিটাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়। ন্যূনতম হলেও প্রত্যেকেই যাতে এই উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হতে পারেন এবং সেই সঙ্গে এর সুফলও ভোগ করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, উন্নয়ন কার্যক্রমগুলো যাতে কোনোভাবেই ক্ষুদ্র কোনো গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হয়ে না পড়ে! উন্নয়নটা পিরামিডের মতো না হয়ে উঁচু সমতল ভূমির মতো হলে সবাই উন্নত জীবনের দেখা পাবেন।
*লেখক: গবেষক