চট্টগ্রাম বন্দর

বেশি দামে অকার্যকর যন্ত্র কিনছে চট্টগ্রাম বন্দর!

যন্ত্রটির নাম ‘অ্যাম্পিবিয়াস এক্সকাভেটর’। জলে ও স্থলে বালু-মাটি অপসারণের যন্ত্র এটি। যন্ত্রটি কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল চট্টগ্রাম বন্দরের যান্ত্রিক বিভাগ। এ জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকায় যন্ত্রটি সংগ্রহের প্রাক্কলিত হিসাব করে।

এ কমিটির ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ না হতেই প্রায় ২০ কোটি টাকায় কাছাকাছি ধরনের নতুন মডেলের একটি খননযন্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে বন্দরের নৌ বিভাগ। এ যন্ত্রটির নাম ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশান ভেহিক্যাল’। যে প্রতিষ্ঠানটি থেকে যন্ত্রটি কেনা হচ্ছে, তারা বলছে, এটি বহুমুখী কাজে ব্যবহূত একটি খননযন্ত্র।

তবে বন্দর সূত্র বলছে, যন্ত্রটি চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য কার্যকর হবে না।

এখন যান্ত্রিক বিভাগ থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকার যন্ত্রটি কেনার প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে নৌ বিভাগের আওতায় ২০ কোটি টাকার যন্ত্রটি কেনা হচ্ছে ‘পলিউশন কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট ফর ইএমইউ’ খাতের অর্থে। তবে বন্দরের ২০১৩-১৪ সালের প্রকাশিত বাজেটে এই খাতে অনুমোদিত বরাদ্দ তিন কোটি টাকা।

এই যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়ায় গণখাতে ক্রয়বিধিসহ (পিপিআর) সরকারি নিয়ম-কানুন অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে। পিপিআর অনুযায়ী, এ ধরনের ক্রয়ের ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরাসরি দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হচ্ছে। ২০১১ সালেও ডিপিপি না করেই নয়টি পণ্য ক্রয় কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। তখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে তা অনুমোদনবিহীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে বন্দর কর্তৃপক্ষ ডিপিপি তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ক্রয় করে।

জানতে চাইলে বন্দরের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর এম শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, বন্দরের আর্থিক ক্ষমতার আওতায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যন্ত্রটি কেনা হচ্ছে। ২০১১ সালে মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দিলেও ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত কেনাকাটার আর্থিক ক্ষমতা বন্দর বোর্ডের রয়েছে। তিনি বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ খাত বন্দরের নৌ বিভাগের আওতায়। এ কারণে নৌ বিভাগের মাধ্যমে এই যন্ত্র কেনা হচ্ছে।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার মাল্টিটেক সিস্টেমস লিমিটেড ২০ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকায় এই যন্ত্র সরবরাহ করছে। এ ব্যাপারে চুক্তিও হয়েছে। এখন বিদেশে গিয়ে যন্ত্র পরিদর্শনের পালা। মূলত ফিনল্যান্ডের তৈরি ‘ওয়াটারমাস্টার ক্লাসিক ফোর’ মডেলের খননযন্ত্র সরবরাহ করবে মাল্টিটেক।

নৌ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বন্দরের ১ ও ২ নম্বর জেটির সামনে বালু-মাটি অপসারণ, ভাঙন হলে পাইলিং করে নদীর তীর রক্ষা, খালের মুখ পরিষ্কার রাখা এবং বন্দরের স্লিপওয়ের মুখে বালু-মাটি অপসারণের কাজে ব্যবহূত হবে এ যন্ত্র। ওয়াটারমাস্টার ক্লাসিক ফোর মডেলের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, এই মডেলের যন্ত্রটি পাঁচ মিটার পানির নিচে কার্যকরভাবে খননকাজ করতে পারে।

বন্দর কর্মকর্তারা জানান, বন্দরের জেটিমুখে পানির স্বাভাবিক গভীরতা এর চেয়ে বেশি। ফলে জেটিমুখে বালু-মাটি অপসারণ এই যন্ত্র দিয়ে সম্ভব হবে না। আবার কর্ণফুলীতে পানির স্রোতের গতি গড়ে ঘণ্টায় চার নটিক্যাল মাইলের বেশি। এই স্রোতে জেটির সামনে চার নটিক্যাল মাইল গতিতে চলা এই যন্ত্র ব্যবহার করে খননকাজের সুযোগ নেই। কর্ণফুলীর বন্দর এলাকায় খননকাজের দায়িত্ব হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের। এই বিভাগ প্রতিবছর দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে জেটিমুখে বালু-মাটি অপসারণের জন্য খননকাজ করছে। প্রতিবছর এ কাজে দুই-আড়াই কোটি টাকা ব্যয় হয়। এবারও একই কাজের জন্য হাইড্রোগ্রাফি বিভাগ দরপত্র আহ্বান করেছে।

ওয়াটার মাস্টার ক্ল্যাসিক ফোর মডেলের খননযন্ত্র প্রস্তুতকারক ফিনল্যান্ডের অ্যাকুয়াম্যাক কোম্পানি ব্যবসার স্বার্থে যন্ত্রটির দাম প্রকাশ করে না। তবে ফিলিপাইনের ২০১১ সালের একটি প্রকল্পের প্রস্তাবে দেখা যায়, একই মডেলের ১০টি ইউনিট ও দুটি বুস্টার সংগ্রহের জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭১ কোটি। অর্থাৎ, প্রতিটি খননযন্ত্রের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে সাত কোটি টাকার মতো।

বন্দর কর্তৃপক্ষ যন্ত্রটি কেন বেশি দামে কিনছে, জানতে চাইলে কমোডর এম শাহজাহান বলেন, এ টাকায় খননযন্ত্র সরবরাহ, শুল্ক-কর পরিশোধ, এক মাস প্রশিক্ষণ ও পরিদর্শনের জন্য বিদেশ সফর—সবই যুক্ত। যন্ত্রটির সঙ্গে আলাদা করে পাইলিং, গ্র্যাব, কাটার পাম্বসহ পাঁচটি আলাদা যন্ত্রাংশ এবং লম্বা পাইপও সরবরাহ করা হবে। এসব যন্ত্র ও সেবার সমন্বিত দাম হিসেবে ঠিকাদার এই দর দিয়েছে। নিয়মানুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতার দরই গ্রহণ করা হয়েছে।