ব্যক্তিগত জমি, বাসাবাড়ি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানে পাহারায় থাকা আনসার প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রথম পর্যায়ে ৫২টি স্থান থেকে আনসার তুলে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সরকারি এই বাহিনীকে সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নেওয়া হবে।
সারা দেশের ৫৯০টি স্থাপনায় আট হাজার ২৪২ জন আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া আছে।
এই নির্দেশের কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, সরকারি এই বাহিনীকে ব্যবহার করে ভূমিদস্যুরা অন্যের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে। এমনকি অন্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছে না তারা।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভূমিদস্যুরা জমি ও বাসাবাড়ি দখল বা দখলের পর তা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এবং বিভিন্ন ব্যক্তি নিজেদের প্রতিষ্ঠান পাহারা দেওয়ার জন্য আনসার নিচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় মোতায়েন করে রাখছে। এক থেকে তিন বছরের চুক্তিতে আনসার নিয়ে ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত এই বাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কিন্তু আনসারের প্রকৃত কাজ হচ্ছে আপৎকালীন, যেমন বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নির্বাচনের সময় র্যাব ও পুলিশের মতো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহযোগিতা করা।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি পাহারা দেওয়ার জন্য সরকারি বাহিনীর এ ধরনের পদায়ন সঠিক নয়। বিশেষ করে জমি বা বাড়ি দখলের জন্যও এখন আনসার ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রেক্ষিত বিবেচনায় আনসার প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আনসার বাহিনী পাবলিক সার্ভেন্ট। আমি পাবলিক সার্ভেন্টকে বেসরকারি বাড়িতে জরুরি ভিত্তিতে দিতে পারি, কিন্তু সব সময়ের জন্য দিতে চাই না।’
আনসারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, পুঁজিপতি ও ভূমিদস্যুরা তাদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে আনসার মোতায়েনের মাধ্যমে বিভিন্ন অরাজক পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। এমনকি তাদের ভূসম্পত্তি নিয়ে আদালতের মামলা-মোকদ্দমা চলমান থাকলেও তা গোপন রেখে বিতর্কিত ভূমিতে আনসার মোতায়েন করে আইনগত সুযোগ নিচ্ছে।
কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, যাঁরা আনসার চেয়ে আবেদন করেন, তাঁরা অধিকাংশই সম্পদশালী ও প্রতাপশালী। আনসার দেওয়ার পর দেখা যায়, তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আসতে থাকে। আনসারদের অস্ত্রের অপব্যবহার করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটান তাঁরা। কাজেই ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূসম্পত্তিতে এভাবে আনসার অঙ্গীভূত করা হলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি জনরোষের সৃষ্টি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোট ৫২টি স্থাপনা থেকে আনসার প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ১০টি স্থাপনা বাদ দিয়ে ৪২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা থেকে আনসার প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে বলা হয়েছে, স্থাপনা নিয়ে মামলা থাকায় ওই ১০টি জায়গা থেকে আনসার প্রত্যাহার করা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে আইনে কী বলা আছে, জানতে চাইলে আনসার ও ভিডিপির পরিচালক ফিরোজ খান (ঢাকা রেঞ্জ) গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলা চলমান থাকলে আমরা কোনো স্থানে আনসার মোতায়েন করি না। এ ছাড়া কোনো স্থানে যদি আনসার মোতায়েন করা হয় এবং পরে যদি আমরা জানতে পারি মামলা রয়েছে, তবে দ্রুত সেখান থেকে আনসার প্রত্যাহার করা হয়। এ-সংক্রান্ত নীতিমালায় এ ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।’
আদেশ হওয়া সত্ত্বের আনসার প্রত্যাহার থেকে বাদ পড়া ১০টি স্থাপনার একটি গুলশানে অবস্থিত। এই বাড়িটি নিয়ে ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে অনেক সংবাদ হয়েছে। ক-৭২/৪ সি, নয়তলা ওই বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন গাজী মাহমুদ কামাল। তাঁর দাবি, তিনি জমি কিনে রাজউকসহ সব বিভাগের অনুমতি নিয়ে বাড়িটি নির্মাণ করেছেন। এদিকে জনৈক এম এম ইকবাল বাড়িটিকে নিজের বলে দাবি করেন। কিন্তু তিনি আনসার মোতায়েনের জন্য যে আবেদন করেন, তাতে জমির দাগ নম্বর দেওয়া হয়। আর জমিটি নিয়ে কোনো মামলা নেই বলে আনসারকে যে অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন, তাতে বাড়ির নম্বর দেখান ক-৭২/৫। এরপর আনসার জেলা কমান্ডার তদন্ত করে দেখেন, ক-৭২/৫ নামে কোনো স্থাপনা এলাকায় নেই। ফলে তাঁরা আনসার নিয়োগের আদেশ বাতিল করেন। কিন্তু গত বছরের ২৫ অক্টবর আবার আনসার নিয়োগ দেওয়া হয়। আনসার সদস্যরা এসে ক-৭২/৪ সি বাড়ির সামনে কয়েক দিন থাকেন। ১ নভেম্বর রাতে তাঁরা জোর করে ওই বাড়িতে ঢুকে অবস্থান নেন।
এরপর গাজী কামাল আনসার প্রত্যাহারের জন্য রিট আবেদন করলে হাইকোর্ট গত ৫ নভেম্বর ক-৭২/৪ সি এবং ক-৭২/৫ উভয় জায়গা থেকে আনসার প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। এম এম ইকবাল এই আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার বিচারপতির কাছে আপিল করেন। আদালত বলেন, যেহেতু ক-৭২/৫ নিয়ে রিটকারী গাজী কামালের কোনো অপত্তি নেই, তাই সেখানে আনসার থাকতে পারে। এরপর আনসারের জেলা কমান্ডার ক-৭২/৫ স্থাপনাটি চিহ্নিত করে দেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে আবেদন করেন। করপোরেশন আনসারকে জানায়, এই হোল্ডিং নম্বর ওই এলাকায় নেই।
এরপর গত ছয় মাস ক-৭২/৪ সি বাড়ির ভেতরে আনসার অবস্থান নিয়ে আছে। সর্বশেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আনসার প্রত্যাহারের তালিকায়ও ক-৭২/৫ স্থাপনার কথা উল্লেখ আছে।
এর আগে রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলার মালছড়ি এলাকার ওয়াগগাছড়া মৌজায় প্লাইউডের জায়গায় আনসারের কার্যক্রম বন্ধের আবেদন করেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হাসান মাহমুদ খান। কিন্তু আনসার সরানো হয়নি।
পিয়ার সার্ভিস সিএনজি স্টেশনের শামসুন মুনীর খান মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন, ক্যান্টনমেন্টে তাঁর পারিবারিক ও পৈতৃক জমি দখলের উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষ আনসার নিয়োগ করেছে।
সাভার উপজেলার এক ব্যক্তি মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন, তাঁর সম্পত্তি দখলের জন্য সেখানে প্রতিপক্ষ আনসার মোতায়েন করেছে।
এসব অভিযোগ পেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে আনসার প্রত্যাহারের এ নির্দেশ দিয়েছেন বলে সূত্র জানায়।