
ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু-সমর্থকেরা ১৯৪৭ সালের ১২ ডিসেম্বর যে সহিংস ঘটনা ঘটায়, পশ্চিমবঙ্গের সংবাদপত্রগুলোয় তা ফলাও করে প্রকাশ করা হয়। অতিরঞ্চিত সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ এনে ‘পূর্ব বাংলা’ (তখনো ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম হয়নি) সরকার ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গের তিনটি পত্রিকার বিরুদ্ধে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
সরকারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত শুক্রবার ঢাকা শহরের অধিবাসীদের বাঙ্গলা ভাষার সমর্থক ও উর্দ্দুর সমর্থক দুই শ্রেণির মধ্যে একটি ছোট খাটো দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। পূর্ব্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান ও ভারতের মুছলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্য কলিকাতার কতিপয় সংবাদপত্র উপরোক্ত ঘটনার সুযোগ গ্রহণ করিয়াছে। এই সংবাদ পত্রগুলিও হইতেছে আনন্দবাজার, ইত্তেহাদ ও স্বাধীনতা।’
ভারতীয় পত্রিকা নিষিদ্ধের এটিই অবশ্য প্রথম উদাহরণ নয়। এর আগেও সেপ্টেম্বর মাসে অমৃতবাজার পত্রিকা, স্বাধীনতা, অভিযাত্রী ও যুগান্তর পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
সরকারি নথি থেকে জানা যায়, ১৪ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় শিরোনাম ছিল ‘রাষ্ট্রের দুষমন’ (ইত্তেহাদ), ‘ঢাকায় একই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত দুইটি দলের মধ্যে বিরোধ’ (আনন্দবাজার পত্রিকা) ও ‘বাংলা ভাষার দাবীকে রক্তাক্ত করিওনা’ (স্বাধীনতা)।
পত্রিকা তিনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে করাচি থেকে প্রকাশিত ডন পত্রিকায় যে সম্পাদকীয় লেখা হয়, তা কৌতূহলোদ্দীপক। এতে বলা হয়েছে: ‘এই পত্রিকাগুলির [নিষিদ্ধ ঘোষিত তিনটি পত্রিকা] মধ্যে একটি আনন্দবাজার পত্রিকা। এ বিষয়ে তাদের আচরণ বোধগম্য। কারণ, তারা সব সময়ই মুসলমান ও পাকিস্তানের আত্মস্বীকৃত শক্র। দ্বিতীয় পত্রিকাটি কমিউনিস্টদের দ্বারা পরিচালিত স্বাধীনতা, যার আচরণ অপেক্ষাকৃত কম বোধগম্য। তারা হৃদয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধারণ করার ভান করে। কিন্তু তৃতীয় পত্রিকা ইত্তেহাদ-এর আচরণ সব থেকে অবাক করার মতো। কারণ, তারা এটিকে শুধু মুসলিম লীগের পত্রিকা বলে ঘোষণাই করে না বরং এটি জনাব এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দীর গণমাধ্যম হিসেবেও পরিচিত। জনাব সোহরাওয়ার্দী বেশ কিছুদিন ধরে দুই দেশের সংখ্যাগরিষ্ট ও সংখ্যালঘিষ্টদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য লড়াই করছেন। তিনি যে পত্রিকার নীতিনির্ধারক, তা পাকিস্তানের মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করলে সেটা মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ দেখায় না। এ অবস্থায় শুধু জনাব সোহরাওয়ার্দীর পত্রিকাই নয়, বরং জনাব সোহরাওয়ার্দীর ওপরও সাম্প্রদায়িক অভিসন্ধির অভিযোগ আরোপিত হবে।’ [ডন, ১৯ ডিসেম্বর ১৯৪৭]
২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জন্মদিন উপলক্ষে পূর্ব বাংলা সরকার ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৪৭ নিষিদ্ধ ভারতীয় পত্রিকাগুলোর ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।