১৭টি শিশু সংগঠনের মধ্যে ১৬টি অস্তিত্বহীন

ভৈরবে ঘরকুনো হয়ে বেড়ে উঠছে শিশুরা

পঞ্চাশের দশকে কিছু উদ্যমী তরুণ কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ‘মুকুল ফৌজ’ নামে একটি শিশু সংগঠন গড়ে তোলেন। উদ্দেশ্য ছিল শিশু প্রতিভা বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ছোট্ট এই শহরটিতে যুক্ত হয় আরও ১৬টি শিশু সংগঠন। পরবর্তী দেড় যুগের ব্যবধানে একটি ছাড়া বাকিগুলো এখন অস্তিত্বহীন। এসব সংগঠনের সঙ্গে প্রায় হাজার খানেক শিশু-কিশোর যুক্ত ছিল।
শিশু সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুকুমার কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় বেশির ভাগ শিশু এখন আত্মকেন্দ্রিক ও ঘরকুনো হয়ে বড় হচ্ছে। কারও কারও ধারণা, এতে করে জীবনের শুরুতেই সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তারা। বিপরীতে বাড়ছে শিশু অপরাধ।
কচি-কাঁচার মেলার সংগঠক অধ্যাপক আতাউর রহমান বলেন, একসময় ভৈরবের শিশুরা দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করত, পথনাটক করত। দুর্যোগ মোকাবিলায় গান গেয়ে সাহায্য সংগ্রহ করত। আর এখন শিশুরা মাদকসেবন ও বহন করছে। চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে মুকুল ফৌজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর মূল সংগঠক ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক মিন্নাত আলী ও কলামিস্ট কমান্ডার (অব.) আবদুর রউফ।
ভৈরবে বর্তমানে মোট শিশুর হিসাব সরকারিভাবে নেই। তবে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মিলন মিয়া জানান, চলতি বছরের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের হিসাবমতে, ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৫৩১। সব মিলিয়ে মোট শিশু এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে। তবে এসব শিশুর সুকুমার কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হলেও এতে যে প্রাণ থাকে না, তা উল্লেখ করেন এই কর্মকর্তা।
১৯৫৬ সালের ৫ অক্টোবর কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার আত্মপ্রকাশের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ভৈরবে সংগঠনটির শাখা কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় কবি জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই, নীলিমা ইব্রাহিম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর, মামুনুর রশীদ একাধিকবার ভৈরব আসরে এসে গতিশীলতার পালে হাওয়া লাগিয়ে যান। ১৯৯৫ সালের পর থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম নেই।
১৯৮০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় কাকলি খেলাঘর আসর। বর্তমানে একমাত্র এই সংগঠনটির কার্যক্রম রয়েছে। সংগঠনটির রয়েছে সমৃদ্ধ শিশু পাঠাগার।
সংগঠনগুলো হারিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে কাকলি খেলাঘর আসরের সংগঠক শরীফ আহমেদ বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের নানা নিম্নমানের অনুষ্ঠানের আধিক্য শিশুদের ঘরকুনো করে ফেলেছে। তথাকথিত জিপিএ অর্জনের জন্য অভিভাবকেরা শিশুদের অবসর সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছেন। ফলে অভিভাবকদের কাছে শিশু সংগঠনের এখন আর গুরুত্ব নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখানকার শিশুদের সৃজনশীলতা বিকাশে চাঁদের হাটের ভূমিকা প্রশংসিত হয়। ১৯৮২ সালে শুরু হয়ে মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে ১৯৯২ সালের শেষের দিকে এসে সংগঠনটির কার্যক্রম থেমে যায়। করবী খেলাঘর, কামিনী খেলাঘর, তটিনী খেলাঘর, আমিরাত খেলাঘর, মেঘনা খেলাঘর, নবাংকুর মেলা, প্রগতি শিশু মেলা, কমলপুর আদর্শ কচি-কাঁচার মেলা, প্রদীপ্ত বোন মেলা ছাড়াও চাঁদের হাট ও কাকলি কচি-কাঁচার মেলার আরও দুটি করে শাখা সংগঠন ছিল। এ সংগঠনগুলো গড়ে এক যুগ সক্রিয় থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে সবগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।