
স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের দলিল সংগ্রহে দৃশ্যমান উদ্যোগ কম। তৈরি হয়নি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আর্কাইভস। জাতীয় জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের ১ হাজার ৫৫১টি নথি থাকলেও তা পড়ে আছে অগোছালোভাবে। জাদুঘরের কর্মকর্তারা জানেন না আলমারিতে তুলে রাখা এসব নথিতে কী আছে। আর জাতীয় আর্কাইভসে এ–সংক্রান্ত দলিল বলতে রয়েছে কিছু পুরোনো পত্রিকা।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও তার পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দলিল সংরক্ষণ করেছে অনেক দেশ, আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়। সেসব দেশে সংগ্রহ করে আনার ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
অথচ দেড় যুগ আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রণয়নে এ–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও দলিল সংরক্ষণ করে একটি স্বাধীনতাযুদ্ধ–বিষয়ক আর্কাইভস তৈরি করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় তাদের মূল কাজটি ঠিকমতো করতে পারেনি। গত ১১ বছর টানা ক্ষমতায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ সরকার। এই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই–বাছাই, রাজাকারের তালিকা ও অমুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের কাজে বেশি তৎপর থেকেছে মন্ত্রণালয়।
মুক্তিযুদ্ধের দলিল বলতে মূলত নথি, বই, চিঠিপত্র, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, স্মরণিকা, ছবি, মানচিত্র, চুক্তিপত্র, সাক্ষাৎকার, দিনপঞ্জি, রেজিস্টার, হিসাব খাতা ইত্যাদিকে বোঝায়। আর এসব দলিলের সাহায্য ছাড়া সঠিক ইতিহাস প্রণয়ন করা কখনোই সম্ভব নয়।
জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেনে নিচ্ছি, দলিল সংগ্রহে আমরা দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিইনি। আমাদের সীমাবদ্ধতা ছিল, আছে। তবে এ কাজে আমরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে সহযোগিতা করেছি। জাতীয় জাদুঘর থেকে কীভাবে দলিল সংগ্রহ করা যায়, আমরা দেখব। দলিল সংগ্রহে মন্ত্রণালয় শিগগিরই একটি প্রকল্প নেবে। স্বাধীনতাযুদ্ধবিষয়ক আর্কাইভসও হবে।’
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলা একাডেমির অধীনে ‘জাতীয় স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা পরিষদ’ দলিল সংগ্রহের কাজ শুরু করলেও বেশি দূর এগোতে পারেনি। এই পরিষদ থেকে সংগ্রহ করা দলিলসহ মোট সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার দলিল সংগ্রহ করে ১৯৭৭ সালে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠন করা হয় ‘মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প’। ১৯৮২ সালে ১৫ হাজার পৃষ্ঠার দলিল নিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র ১৫ খণ্ড বের হয়। এরপর এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়।
>নেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আর্কাইভস
জাদুঘরে অযত্নে ১৫৫১টি নথি
গুরুত্বপূর্ণ দলিল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত
গুরুত্বপূর্ণ এসব দলিলের বেশির ভাগ ১৯৮৮ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সময় একটি সরকারি ভবনের গাড়ির গ্যারেজে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল বস্তাবন্দী এসব দলিল। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের নির্দেশে সেই সময় জাতীয় জাদুঘরে ১ হাজার ৫৫১টি নথি আনা হয়েছিল।
সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, লাইব্রেরির এক কোনায় তিনটি আলমারিতে জরাজীর্ণ অবস্থায় নথিগুলো পড়ে আছে। প্রায় ৩১ বছর ধরে ফাইলবন্দী থাকায় দলিলের অনেক ফটোকপি অস্পষ্ট হয়ে গেছে। কোন দলিল যে কিসের, তা বোঝার উপায় নেই। গবেষণার জন্য কেউ কোনো তথ্য চাইলে একটি একটি করে পাতা দেখে তা বের করতে হয়।
এ অবস্থা কেন—জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহম্মদ বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে এসব নথিতে মূল কপির চেয়ে ফটোকপির সংখ্যা বেশি। আর ফটোকপি তো ক্যাটালগ করা যায় না। তাই আমরা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে স্ক্যান করে নিয়ে যেতে বলেছি, কিন্তু নেয়নি।’
আগারগাঁওয়ে জাতীয় আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কোনো দলিল নেই। তাদের সংগ্রহে প্রশাসনিক দলিলই বেশি। যদিও জাতীয় আর্কাইভস প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের দলিল-দস্তাবেজ সংগ্রহ। যুদ্ধকালে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারেরও কোনো দলিল জাতীয় আর্কাইভসের কাছে নেই। মুক্তিযুদ্ধের দলিল বলতে পুরোনো কিছু দেশি-বিদেশি দৈনিক পত্রিকা সংগ্রহে আছে।
জাতীয় আর্কাইভসের পরিচালক মো. সুজায়েতউল্যা প্রথম আলোকে বলেন, ‘যা ছাপা বা প্রকাশিত হয়, আমরা একমাত্র তা–ই সংগ্রহে রাখতে পারি। এ ক্ষেত্রে আমরা পুরোনো পত্রিকা রেখেছি। এ ছাড়া কিছু মুক্তিযুদ্ধের বই আছে, যা বাজারেও পাওয়া যায়।’
এ ছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর দলিলপত্র স্বরাষ্ট্র, আইন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ও সেনাবাহিনীর কয়েকটি জাদুঘরে রয়েছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে যেসব মুক্তিযোদ্ধার ব্যক্তিগত নথি তৈরি হয়েছিল, তা পরে ভারত সরকার বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে। দলিলগুলো সেনাবাহিনী সংরক্ষণ করছে। বেসরকারি উদ্যোগে কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এদের সংগ্রহেও কিছু দলিল আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আরও আছে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, জেনোসাইড আর্কাইভ অ্যান্ড হিউম্যান স্টাডিজ সেন্টার এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র।
আইন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘুরে জানা যায়, ১৯৭৩ সালে দালাল আইনে করা মামলার আসামিদের নাম–ঠিকানাসহ যাবতীয় নথিপত্রসংক্রান্ত কোনো তথ্য আইন মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত নেই। কে, কখন, কীভাবে এসব নথি গায়েব করেছে, তা–ও জানে না স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়। মামলার নথিপত্রের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারের তালিকা ও দালালদের শনাক্তকরণ দলিলের অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দালালদের বিচারের জন্য যে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল, সেগুলোর সরকারি দলিলপত্র নেই। দালাল আইনের আওতায় ১১ হাজার মামলা হয়েছিল। এসব দলিল আইন মন্ত্রণালয়ে থাকার কথা। আইনমন্ত্রীর ধারণা, এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক মেজর (অব.) এ এস এম সামছুল আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংগ্রহের দিকে কারও নজর নেই। দেশি হোক বা বিদেশি হোক মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উচিত এগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষিত রাখা। আর দেরি না করে সরকারের উচিত এখনই দলিল সংগ্রহে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া।