প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক: আসুন নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি

মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ করতে হবে

কারওয়ান বাজারে গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘আসুন নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা l ছবি: প্রথম আলো
কারওয়ান বাজারে গতকাল প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘আসুন নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা l ছবি: প্রথম আলো

মাতৃমৃত্যু রোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি-৫) অর্জনের পথেই রয়েছে। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে বসে থাকার সুযোগ নেই। বর্বর যুগের মতো এখনো শুধু মা হতে গিয়ে বহু নারী মারা যাচ্ছেন। আলোচকেরা বলেন, গত বছরের হিসাবে দেশে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে জীবিতজন্মে (জীবিত সন্তান জন্ম দেওয়া) ১৭০। ২০১৫ সালের মধ্যে তা কমিয়ে ১৪৩-এ নামিয়ে আনতে হবে। তবে একজন মা-ও যাতে মারা না যান, তার জন্য সমন্বিতভাবে কৌশলগত পদ্ধতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে।
গতকাল সোমবার বিকেলে ‘আসুন নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকেরা এসব কথা বলেন। বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো। সহযোগিতা করে জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফ।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
গোলটেবিল বৈঠকে শুধু মা হতে গিয়ে যাতে কেউ মারা না যান, সেই বিষয়টিকে একটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান আলোচকেরা। এ ছাড়া খুলনা অঞ্চলে মাতৃমৃত্যুর হার কম, আবার সিলেটে তা বেশি কেন? এ ধরনের অন্যান্য অঞ্চলকে চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায় বৈঠকে। দেশে স্বাস্থ্য খাতে জনবলের সংখ্যা একেবারে কম না হলেও জনবল সঠিকভাবে কাজ করছে না, জনবলেরও নিয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য আছে। এসব বিষয়ে সরকারকে নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
আলোচনায় স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন বলেন, মাতৃত্বকে নিরাপদ করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার আছে। সবাই মিলে সমন্বিতভাবে কাজ করলেই এ অঙ্গীকার পূরণ করা সম্ভব। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রসবের হার বাড়ানো, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ রোধে মিজোপ্রোস্টল ট্যাবলেটের সঠিক ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রচার চালাতে হবে। সরকারের যে পরিমাণ অবকাঠামো আছে, তার যথাযথ ব্যবহার এবং নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টিতে স্বাস্থ্যসচিব গুরুত্ব দেন।
গোলটেবিল বৈঠকে দেশের মাতৃমৃত্যুর পরিস্থিতি, কারণ এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান লিয়ানা কুপেন্স। তিনি খিঁচুনি বা রক্তক্ষরণের মতো প্রত্যক্ষ কারণের বাইরে জন্ডিস, হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন পরোক্ষ কারণে মায়ের মৃত্যুকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া প্রসবের পর ৭৩ শতাংশ মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি মোকাবিলার ওপর জোর দেন। জরুরি প্রসূতি সেবাকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা বিশেষজ্ঞ জনবলের উপস্থিতি নিশ্চিতের বিষয়েও তিনি সরকারকে নজর দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নূর হোসেন তালুকদার বলেন, স্বাস্থ্য খাতে কর্মরতদের বদলি করার পর তদবির শুরু হয়ে যায়। আবার অনেককে রাজনৈতিক কারণেই বদলি করা যায় না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা) আবু জাফর মো. মুসা মাতৃমৃত্যু রোধের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য প্রতিরোধ এবং ধনী ও দরিদ্র মায়েদের মধ্যে মৃত্যু রোধে যে বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ পেশাজীবীদের জাতীয় ফোরাম অবস্ট্রেটিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি লতিফা শামসুদ্দিন বলেন, জেলা হাসপাতালে বেশির ভাগ চিকিৎসক বেলা দুইটার মধ্যে কাজ শেষ করে ঢাকার পথে রওনা হন। স্বাস্থ্য খাতে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শরীফ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের পরিমাণ যত বাড়ানো যাবে, মা ও শিশুর মৃত্যুর হার ততই কমবে। তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব স্বাস্থ্য অবকাঠামো আছে, সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহারের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সেভ দ্য চিলড্রেনের চিফ অব পার্টি (এমসিএইচআইপি) ইশতিয়াক মান্নান বলেন, মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পরও বছরে হাজার হাজার মা মারা যাবেন। এ ধরনের অবস্থা বর্বর যুগে চলতে পারে। তাই মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অগ্রসর হতে হবে।
ইশতিয়াক মান্নান নিরাপদ মাতৃত্বকে একটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান।
ইউনিসেফের পুষ্টি বিশেষজ্ঞ মহসীন আলী বলেন, মাতৃমৃত্যু রোধে পুষ্টির বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে। দেশের ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী শতকরা ১৩ জন নারীর উচ্চতা ১৪৩ সেন্টিমিটারের কম। তাঁরা প্রসব-জটিলতার সম্মুখীন হবেন। অন্যদিকে রক্তস্বল্পতাও মাতৃমৃত্যুর জন্য বড় একটি কারণ। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী এ টি এম ইকবাল আনোয়ার বলেন, দেশে গর্ভপাতের কারণে মায়েদের মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। যেসব মা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ, তাঁদের সহায়তায় পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে বেসরকারি পর্যায় থেকে স্বাস্থ্যসেবা এমনকি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার বেড়েছে। কিন্তু এ খাতে কোনো নজরদারি নেই৷ নজরদারি বাড়াতে হবে।
প্রজননস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মোমেনা খাতুন মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষায় দক্ষ জনবলের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন।
ব্র্যাকের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং জনসংখ্যা বিভাগের প্রধান ফেরদৌসী বেগম বলেন, ব্র্যাকের বিভিন্ন কর্মএলাকায় বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নের কারণে জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে এসব এলাকায় মাতৃমৃত্যুর হার কম। তিনি ১৮ বছরের আগে বিয়ে হলেও যাতে দ্রুত মা না হন, সে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন।
ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রিয়াদ মাহমুদ বলেন, দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে ২২ শতাংশ মাকে প্রসব করানো সম্ভব। তাই হাসপাতালে শয্যা বাড়াতে হবে। কেন, কখন, কীভাবে মা মারা যাচ্ছেন, তা প্রতিরোধের উপায় ছিল কি না, এ ধরনের বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহায়তায় ১০টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ কার্যক্রম সরকারকে সারা দেশে বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মাতৃস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শামিনা শারমিন বলেন, ইউএনএফপিএর সহায়তায় এক হাজার ১০০ দক্ষ প্রসব-সহায়তাকারী বা মিডওয়াইফকে প্রশিক্ষণ দিয়ে এলাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে তাঁদের অনেকেই যথাযথ কাজটি করতে পারছেন না। তাঁদের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে না রেখে অন্য বিভাগে কাজ করানো হচ্ছে। ফলে তাঁদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি কাজে লাগছে না।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রধান উপদেষ্টা ইউকি ইয়োশিমুরা স্বাস্থ্য অবকাঠামোগুলোতে নারীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেন। মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মেডিকেল অফিসার হ্যাডি ডায়ালো স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা, উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা, দক্ষ জনবল বাড়ানো এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কার্যকর করার সুপারিশ করেন।