
সাজানো-গোছানো ভবন। ভেতর-বাইরে রং করা। রয়েছে বিদ্যুৎ, সোলার প্যানেল, নিরাপদ পানির জন্য গভীর নলকূপ। নারী-পুরুষের পৃথক টয়লেট। আছে পরিচ্ছন্ন প্রসবকক্ষ। অপেক্ষমাণ সেবাপ্রার্থীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা। ভবনে সহজে যাতায়াতের জন্য প্রতিবন্ধীদের জন্য র্যাম্প।
এ চিত্র সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের বালিয়াঘাট কমিউনিটি ক্লিনিকের। অথচ তিন বছর আগেও এটিসহ উপজেলার ১৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের পরিবেশ ছিল ভিন্ন। কোনোটি ছিল পরিত্যক্ত অবস্থায়। কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। এখন বাড়ির কাছেই মানুষ পাচ্ছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠা হয়। সরকারিভাবে এসব ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা হলেও এর জমি দেন স্থানীয় লোকজন। পরে এসব ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন এগুলো প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। ফলে ক্লিনিকের পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোও ছিল অকার্যকর। পরে ২০০৯ সালে আবার এগুলো চালু হয়। এখন সব কটি কমিউনিটি ক্লিনিকেই অন্য সেবার পাশাপাশি নারীদের গর্ভকালীন নানা সেবা, পরামর্শ এবং স্বাভাবিক প্রসব হয়। এসব ক্লিনিকে অন্য সেবার পাশাপাশি নারীদের স্বাভাবিক প্রসব বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র আরও জানায়, ২০১৬ সালে এপ্রিল থেকে এই উপজেলায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এফারটস ফর রুরাল অ্যাডভান্সমেন্ট (ইরা) ওয়াটারএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় উপজেলায় ‘ওয়াশ ইন হেলথ’ নামের একটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক ব্যবস্থাপনায় থাকা স্থানীয় লোকদের নিয়ে গঠিত কমিউনিটি গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করা হয়। প্রতিটি ক্লিনিকে রয়েছে একটি করে দানবাক্স। সেবাপ্রার্থীরা তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাতে দান করেন। অংশীদারি তহবিল ও দান থেকে পাওয়া টাকা দিয়েই ক্লিনিকের প্রয়োজনীয় সংস্কারসহ ছোটখাটো কাজ করা হয়।
আবদুল মৌলার বাড়ি তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের মাটিয়ান হাওরপাড়ের গোলকপুর গ্রামে। বালিয়াঘাট কমিউনিটি ক্লিনিকে তাঁর মেয়ে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সন্তান জন্ম দেন। তিনি বলেন, তখন ভরা বর্ষা। মেয়ে সুবর্ণা বেগম (২২) যখন প্রসবব্যথায় কাতর, তখন রাত। কী করবেন ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না তিনি। নৌকা ভাড়া করে মেয়েকে নিয়ে হাওর পাড়ি দিয়ে যেতে হবে উপজেলা সদরে। হাতে টাকা নেই, মিলছিল না নৌকাও। তখন এক প্রতিবেশী বলেন পাশের গ্রামে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে যেতে। পরে দ্রুত সেখানে নিয়ে যান সেখানে। পরে প্রশিক্ষিত ধাত্রীর হাতে সুবর্ণা এক ছেলেসন্তানের জন্ম দেন।
বালিয়াঘাট কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) বিলাল হোসাইন বলেন, এলাকার ১৪টি গ্রামের মানুষ তাঁর এখানে সেবা নিতে আসেন। এখানে ২৭ ধরনের সেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। তিনি বিনা বেতনে কাজ করেন। তবে সেবাপ্রার্থীরা খুশি হয়ে যা দেন, তা তিনি নিয়ে থাকেন। তাঁর ক্লিনিকে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার মানুষ সেবা নেন। এর মধ্যে নারী-শিশুই বেশি। গত তিন বছরে তাঁর এখানে ৫২ জন নারীর নিরাপদ প্রসব হয়েছে।
উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খসরুল আলম জানান, তাঁর ইউনিয়নে চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। তিনি দুটির সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তবে ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের সরবরাহ কম। এটি বাড়ানো দরকার।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুমন চন্দ্র বর্মণ জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে অন্যান্য সেবার পাশাপাশি নারীদের স্বাভাবিক প্রসবের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বেশি। এখন উপজেলার প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিক বেশ ভালো অবস্থায় চলছে। অবশ্য এ জন্য সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে।