যাবজ্জীবন মানে আমৃত্যু দণ্ড?

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে কী? ৩০ বছর, নাকি আমৃত্যু কারাদণ্ড?
তর্কটা তুললেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। গতকাল রোববার গাজীপুরে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শন করে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘আমাদের জেল কোড (কারাবিধি) অনেক পুরোনো। এটা নিয়ে ব্রিটিশ আমলে অনেক জগাখিচুড়ি হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে একধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। এটা নিয়ে অপব্যাখ্যাও রয়েছে। যাবজ্জীবন অর্থই হলো যাবজ্জীবন, একেবারে রেস্ট অব দ্য লাইফ (জীবনের বাকি সময় পর্যন্ত)।’
প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। জানতে চাইলে গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের পেনাল কোড (দণ্ডবিধি) ও জেল কোড (কারাবিধি) একসঙ্গে মিলিয়ে পড়লে দেখা যায়, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড আসলে ৩০ বছর নয়, স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কারাদণ্ড।’
তবে এ কথা মানতে রাজি নন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দণ্ডবিধির ৫৭ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড গণনা করা হবে ৩০ বছর। এর বিকল্প কিছু করতে গেলে আইনের পরিবর্তন করতে হবে। এর আগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ছিল ২০ বছর। ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকারের আমলে আইন পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ৩০ বছর করা হয়। তাই আইন পরিবর্তন না করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে আমৃত্যু কারাদণ্ড হিসেবে কার্যকর করা সম্ভব নয়।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন প্রথম আলোকে বলেন, ইংরেজিতে যেটা বলা হয় ইমপ্রিজনমেন্ট ফর লাইফ, বাংলায় তাকে বলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আক্ষরিক অর্থ ধরা হলে আজীবনের জন্য কারাগারে থাকতে হবে। আর দণ্ডবিধি অনুসারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানে ৩০ বছর, এটা প্র্যাকটিস। এখন যদি এটা নিয়ে কোনো বিতর্ক ওঠে কিংবা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই ব্যাখ্যা দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা সর্বোচ্চ আদালতের। যদি এই প্রশ্ন আপিল বিভাগের সামনে যায়, আদালতই ঠিক করে দেবেন আসলে কোনটা সঠিক।
বর্তমানে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ৩০ বছর মেয়াদেই সাজা খাটছেন। এর প্রথম ব্যত্যয় দেখা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোর রায় দেওয়া শুরু হলে। একাধিক রায়ে দেখা গেছে, বিচারকেরা ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ ভোগের সাজা দিয়েছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আপিলের রায়ে যেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সে জন্য আদালত সুনির্দিষ্টভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ করে দিয়েছেন। ওই রায়ে আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইন সংশোধন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডকে স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত কারাদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে দণ্ডবিধি ও কারাবিধি এখনো সংশোধন করা হয়নি।
তবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে দণ্ডবিধি প্রযোজ্য নয়। এ জন্য যুদ্ধাপরাধের মামলার রায়ে আলাদাভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছেন। কিন্তু ওই আইন সাধারণভাবে প্রযোজ্য হতে পারে না।
বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার মনে করেন, দণ্ডবিধির ৫৭ ধারায় যাবজ্জীবনের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটাই থাকা উচিত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আইনে যাবজ্জীবনের সংজ্ঞা স্পষ্ট। তাই যতক্ষণ না আইন পরিবর্তন হচ্ছে, ততক্ষণ অন্য কোনো ব্যাখ্যা আসতে পারে না।