
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল ফটকের ডান পাশ দিয়ে নিচের ছড়াটায় নেমে গেলাম। রোদ ও ছায়ায় ধীরে ধীরে প্রায় আধা কিলোমিটার সর্পিল ছড়াটায় হেঁটে রেলসেতুর নিচে পৌঁছালাম। মিনিট দশেক জিরিয়ে নিলাম। সেতুর গোড়ায় কিছুটা পানি জমে আছে, এক লাফে পেরোতে পারলাম না। এরপর সন্তর্পণে হেঁটে হেঁটে লেবুবাগানের কাছাকাছি এলাম। যাদের খুঁজছি, তাদের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না। অথচ কী সুন্দর ঝলমলে মিষ্টি রোদ আজকে। তাহলে ওদের কেন দেখছি না?
নিরাশ হলাম না। পা টিপে টিপে লেবুবাগানের শেষ প্রান্তে চলে এলাম। ছড়ার এই অংশে বালুর দানা কিছুটা বড়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ক্ষীণধারার বালুময় ছড়ার প্রতি ইঞ্চি জায়গায় ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার দিয়ে চোখ বোলালাম। হ্যাঁ, দেখা মিলল। তবে বেশিক্ষণ সময় পেলাম না। ওরা দ্রুত উড়ে গাছের ওপরের দিকে চলে গেল। কয়েকটা ভালো ছবি পেলাম।
এতক্ষণ যাদের কথা বললাম, ওরা এ দেশের এক বিরল প্রজাতির প্রজাপতি—লাঠিয়াল (Five-bar Swordtail)। হলদে খঞ্জর নামেও পরিচিত। Papillionidae পরিবারভুক্ত প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Graphium antiphates.
লাঠিয়াল মাঝারি আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় ডানার দৈর্ঘ্য ৮.০-৯.৫ সেন্টিমিটার। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। সামনের ডানার ওপরে রং সাদা ও তার ওপর পাঁচটি কালো ডোরা। ডানার নিচটা দেখতে ওপরের মতোই, তবে কালো ডোরার মধ্যবর্তী অংশে সাদার ওপর সবুজের আভা রয়েছে। পেছনের ডানার নিচের ভিত্তিমূল সবুজ ও তাতে কমলা-হলদে পার্শ্বদাগ রয়েছে। ডানার মতো দেহ এবং পায়েও একই ধরনের রং ও কারুকাজ দেখা যায়। তলোয়ারের মতো লম্বা লেজটি সাদায় মোড়ানো কালচে-বাদামি। শুঁড় এবং চোখ গাঢ় কালো রঙের।
লাঠিয়াল সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি ও আর্দ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা দলে দেখা যায়। এরা বেশ দ্রুতগতিতে ও বাহারি ঢঙে ওড়ে। সচরাচর গাছের ওপরের দিকে চক্রাকারে উড়তে থাকে। অবশ্য প্রায়ই নিচের ভেজা মাটি বা বালুতে নেমে আসতে দেখা যায়। সকালে ও বিকেলে রসের খোঁজে এরা ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়। পুরুষগুলোকে প্রায়ই ভেজা বালু বা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে বসে রস চুষে খেতে দেখা যায়।
স্ত্রী লাঠিয়াল প্রজাপতি পোষক গাছের কুঁড়ি বা কচি পাতার নিচ দিকে পাতাপ্রতি একটি করে ঘিয়ে-সাদা রঙের মসৃণ ও গোলাকার ডিম পাড়ে। তিন-চার দিনে ডিম ফুটে সাদা রঙের শূককীট বের হয়। দুবার রূপান্তরিত হয়ে এটির বর্ণ হলদে-কমলা হয়ে যায় ও পঞ্চম বা শেষ রূপান্তর পর্যায়ে লালচে-বাদামি রং ধারণ করে। এরপর শূককীটটি মুককীটে পরিণত হয়। হালকা সবুজ রঙের মুককীটের খোলস কেটে পূর্ণাঙ্গ লাঠিয়াল প্রজাপতি বের হতে প্রায় ১২ দিন সময় লাগে। বিরল ও সুদর্শন এই প্রজাপতিটি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশেও বিস্তৃত।