
শান্ত নাম শুনলেই বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে। আমার একমাত্র ভাই শান্ত। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে স্লোগান দিতে দিতে যে চলে গেল, সে-ই তারিকুল ইসলাম শান্ত।
এখন যে শান্তর কথা বলছি, সে নিতান্ত এক শিশু। শান্ত ইসলাম নামের এ শিশুটির বয়স মাত্র ১১ বছর। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। বাবা সোবহান চায়ের দোকান চালান। এই তার পরিচয়।
গত শনিবার দেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়েছে শান্তর ছবি আর খবর। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর রাজপথে উপুড় হয়ে নিথর পড়ে ছিল সে। মাথা আর পিঠে ছররা গুলির চিহ্ন। জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী ও পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে তার এ অবস্থা। চিকিত্সকেরা বলেছেন, শান্তর মৃত্যুর আশঙ্কা নেই। তবে শিশুটি যেভাবে জখম হয়েছে, তার যন্ত্রণা নেহাত কম নয়।
যে রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে শান্তর এ করুণ পরিণতি, এর পটভূমির সঙ্গে তার আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। এমন সম্পর্ক ছিল না অবরোধ-সমর্থকদের দেওয়া আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া কিশোর মনির আর হাসানেরও। কাভার্ডভ্যানে পেট্রলবোমা হামলার আরেকটি ঘটনায় মা সুমির সঙ্গে পুড়ে মারা যায় আট বছরের সানজিদা। সেও কি কখনো সরকার আর বিরোধী দলের ক্ষমতার রশি টানাটানি নিয়ে ভেবেছে? তিন বছরের শিশু লিমা ও ১১ বছরের তোফাজ্জল জানত না লালটেপ মোড়ানো নির্জীব বস্তু অকস্মাৎ বিদীর্ণ হয়ে তাদের হাতের বারোটা বাজাবে।
এসব শিশু রাজনীতি বোঝে না। সরকারের একগুঁয়ে মনোভাব আর বিরোধী দলের দাবিতে অটল থাকা নিয়েও কোনো মাথাব্যথা নেই তাদের। বাবা-মায়ের স্নেহের ওমে থেকে ছোট ছোট নিষ্কলুষ স্বপ্ন ও আবদার নিয়ে দিন কাটে ওদের। একটুখানি ভালো খাওয়া আর পরাতেই ওদের খুশি। ওরা থাকে শিশুসুলভ খুনসুটি আর চপলতা নিয়ে। ক্ষমতার মসনদে কে এল আর কে গেল—ওদের মাথায় এমন জটিল বিষয় স্থান পাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ সরকার আর বিরোধী জোটের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে ঘটা সহিংসতার বলি হচ্ছে ওরা। সহজ করে বলতে গেলে, বড়দের পাপের ফল ভুগতে হচ্ছে এই শিশুদের। এ জন্য সরকার বা বিরোধী জোট কেউ যেন দায়ী না! সন্তান হারানো বাবা-মায়ের কাছে যায়নি সান্ত্বনা বা সহানুভূতি জানাতে।
ঘুমন্ত শিশুকে রেখে কাভার্ডভ্যান আর বাসে আগুন দেওয়ার মধ্যে যে হিংস্রতা, তা আর যা-ই হোক, সুস্থ কোনো আন্দোলন নয়।
এ তো গেল সহিংসতার শিকার শিশুদের কথা। হরতাল-অবরোধে অবরুদ্ধ হয়ে নানা দুর্ভোগের শিকার হয়েছে কোটি শিশু। সম্প্রতি শেষ হয়েছে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও প্রাথমিক স্কুল সার্টিফিকেট (পিএসসি) এবং সমপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা। অবরোধ ও হরতালের কারণে বারবার পিছিয়ে গেছে এসব পরীক্ষা। পরীক্ষার সময় যানবাহন সংকট ও সহিংসতার কারণে অভিভাবক-পরীক্ষার্থী উভয়কেই পোহাতে হয়েছে অশেষ দুর্ভোগ। কখনো কখনো সন্তানের পরীক্ষার চেয়ে তার ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফেরাটাই মুখ্য হয়ে উঠেছে অভিভাবকদের কাছে।
পিএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য এটাই ছিল জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। দেশজুড়ে লাখো পরীক্ষার্থীকে তিক্ত এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা শেষ করতে হয়েছে। হরতাল-অবরোধে বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক ঘটনা ও সহিংস হামলায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় তাদের পরীক্ষা দেওয়ার আনন্দময় রোমাঞ্চ মাটি হয়ে গেছে। কবে পরীক্ষা শেষ হবে—ত্রাহি ত্রাহি একটা ভাব ছিল সবার মধ্যে। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষার্থীরা এখন হাতে অখণ্ড অবসর নিয়ে ঘরের ভেতর অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছে। ফল প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের যে লম্বা ছুটি, হরতাল-অবরোধে সহিংসতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় ইচ্ছামতো হেসেখেলে বেড়িয়ে তারা সে ছুটি উপভোগ করতে পারছে না।
বিরোধীদলীয় জোটের চলমান আন্দোলন ও সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষাও হুমকির মুখে। এর মধ্যে সবাইকে গড়ে উত্তীর্ণ করে দেওয়ার একটা দাবি উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অবশ্য জোরালোভাবে এ দাবি নাকচ করেছেন।
পরিস্থিতির কারণে ভুক্তভোগী এসব শিশুর মাথায় কিছুটা হলেও দেশের রাজনীতি ঢুকবে এবং অবশ্যই তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ওই শিশুরা হয়তো ধরে নেবে, রাজনীতি মানেই সহিংসতা, নাশকতা আর নিরাপত্তাহীনতা। এ অনুভূতি তাদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
আজ থেকে ৪২ বছর আগে যাঁরা একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্য বুকের রক্ত ঢেলে যুদ্ধ করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই চাননি এ ফুলের মধ্যে বিষ ছড়াবে পেট্রলবোমার মতো আতঙ্কের কীট। চার দশক আগে এই বিজয়ের মাসে সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা নিয়ে যখন চারদিকে আনন্দের ফোয়ারা বইছিল, ওই সময় কেউ কি ভেবেছিলেন দেশ পরিচালনা নিয়ে এমন বিভেদ আর বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে?
কোনো দেশে যখন রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, আইনশৃঙ্খলা হুমকির মুখে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেকায়দায় পড়ে সে দেশের দুর্বল ও অসহায় মানুষেরা; বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। এর মধ্যে শিশুরা আবার বেশি অরক্ষিত। মধ্যপ্রাচ্যের এ সময়ের সবচেয়ে অস্থিতিশীল দেশ সিরিয়া এর উজ্জ্বল উদাহরণ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক থিংক ট্যাংক অক্সফোর্ড রিসার্চ গ্রুপের তথ্যমতে, প্রায় তিন বছর ধরে চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ১২ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। এসব শিশুর বেশির ভাগ মারা গেছে বোমা আর গুলিতে।
আমাদের সার্ক ভাই শ্রীলঙ্কায় ইউনিসেফের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে শেষ হওয়া গৃহযুদ্ধে সে দেশে শত শত শিশু নিখোঁজ হয়েছে। বেশির ভাগ শিশুই তামিল। এসব শিশু যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতিসংঘ এখনো হদিস করার চেষ্টা চালাচ্ছে এসব শিশুর।
এভাবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মালি, কলাম্বিয়া—এমন অনেক দেশের উদাহরণ তুলে ধরা যায়, যেসব দেশে জিইয়ে থাকা অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার কারণে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে নিয়মিত। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা যত স্থায়ী হবে, সহিংসতা যত বাড়বে, শিশুরা তত অরক্ষিত ও অনিরাপদ হয়ে পড়বে। মায়েদের বুক খালি হওয়ার আশঙ্কাও তত বাড়বে।
দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখে এখন কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, পরিণতি কোন দিকে গড়াবে। কারণ সরকার ও বিরোধী জোটের সংলাপে ইতিবাচক কোনো ফল আসেনি। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে নির্বাচনের তরিতে সরকার একতরফা বৈঠা মেরে চলেছে। বিরোধী জোটও চালিয়ে যাচ্ছে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি, যার জের ধরে প্রতিদিনই চলছে প্রাণ-সংহারী জ্বালাও-পোড়াও। শান্তির অন্বেষণে এর মধ্যে ব্যবসায়ীরা সাদা পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। সাধারণ মানুষ এখনো নীরব। দৃশ্যত তারা একধরনের ধন্দের ঘূর্ণাবর্তে হাবুডুবু খাচ্ছে। কোন দিকে যাবে বা কী করা উচিত, ভেবে কূল পাচ্ছে না। তবে একটা ব্যাপারে সবার প্রত্যাশা অভিন্ন। সবাই চায়, লাখো শহীদের রক্তে স্বাধীন হওয়া এই বাংলার মাটিতে সাধারণ সব মানুষের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত হোক।
একটি শিশু খেলতে গিয়ে ককটেল বিস্ফোরণে আহত হবে, বেড়াতে গিয়ে সন্ত্রাসের আগুনে পুড়ে মরবে—এটা কারোরই কাম্য নয়। আমরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া ফুলটির নির্মল সুবাস নিয়ে বাঁচতে চাই।