অনুষ্ঠানস্থলের এক পাশে বেঞ্চ, টেবিল, ব্ল্যাক বোর্ড দিয়ে সাজানো, যেন একটি গোছানো শ্রেণিকক্ষ। মূল মঞ্চও ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আদলে সাজানো। অনুষ্ঠান শুরু হয় বিদ্যালয়ের মতো ঘণ্টা বাজিয়ে, অ্যাসেম্বলিতে সবাই মিলে জাতীয় সংগীত গেয়ে।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর একটি পাঁচতারা হোটেলে এভাবে ভিন্ন রকমের আয়োজনের মধ্য দিয়ে সারা দেশ থেকে বাছাই করা ১১ জন স্কুলশিক্ষককে আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা, ২০২১ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে সম্মাননা পাওয়া শিক্ষক ও অতিথিরা বলেছেন, শিক্ষকেরা সম্মানিত হলে জাতি সম্মানিত হয়। শিক্ষকেরাই সুন্দর ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সেতুবন্ধ হলো ভক্তি ও স্নেহের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এটি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আবারও তা ফিরিয়ে আনতে হবে।
এবার তৃতীয়বারের মতো প্রিয় শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হলো। সারা দেশ থেকে মনোনয়ন পাওয়া ১ হাজার ৬৯৭ জন শিক্ষকের মধ্য থেকে ১১ জনকে নির্বাচিত করেন বিচারকমণ্ডলী।
ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের জীবনে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যে প্রিয় কিছু শিক্ষকের আদর্শ হয় মানুষের পথচলার প্রেরণা। এর মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষকই হন স্কুলজীবনের। তেমন কিছু শিক্ষক পেলেন এবারের সম্মাননা। তাঁরা হলেন খুলনার ঘুগরাকাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী শিক্ষক এস এম শাহাবুদ্দীন, বগুড়া জিলা স্কুলের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক রওশন আরা বেগম, নোয়াখালীর খলিলুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ, রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক সহকারী শিক্ষক মো. শফিয়ার রহমান, ময়মনসিংহ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক তাপস মজুমদার, রাজবাড়ীর ইন্দুরদী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ছিদ্দিকুর রহমান, মাগুরার শালিখা থানা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীবাস চন্দ্র বিশ্বাস, কক্সবাজারের মহেশখালীর গোরকঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিতালী প্রভা দে, শরীয়তপুরের ১২৯ দক্ষিণ সখীপুর সিকদারবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার, বগুড়ার শেরপুরের উপজেলা সদর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহনাজ পারভীন ও নাটোরের দিয়াড় গাড়ফা খৈরাশ (ডি কে) উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হায়দার আলী।
শিক্ষকেরা সবাই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সম্মাননা গ্রহণ করেন। সম্মাননা হিসেবে উত্তরীয়, ক্রেস্ট, সনদ ও চেক তুলে দেন সরকারের মন্ত্রী, সাংসদ ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা। অনুষ্ঠানে সম্মানিত শিক্ষক ও অতিথিরা নিজেদের অনুভূতিও ব্যক্ত করেন।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের নামকরা কয়েকজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে তাঁদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তবে তিনি তাঁর প্রিয় শিক্ষক হিসেবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কথাই বললেন। ওই শিক্ষকের কারণেই তিনি আজকের অবস্থানে আসতে পেরেছেন।
সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর প্রিয় শিক্ষকদের স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতি নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, এখন পরীক্ষা রীতিমতো ভীতিকর অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। জিপিএ-৫ নির্যাতনে ছেলেমেয়েরা অতিষ্ঠ।
স্বাগত বক্তব্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ আজ সম্ভাবনার দিক দিয়ে পৃথিবীতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন মাপকাঠিতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। কিন্তু শিক্ষাকে সব স্তরে পৌঁছে দেওয়া গেলেও শিক্ষার মানটি সম্ভবত রক্ষা করা যায়নি। সামনের দিনে দেশের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর শিক্ষার বড় উপাদান হলেন শিক্ষকেরা। শিক্ষকদের সম্মান ও সম্মাননা—দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের সম্মাননা পাওয়া শিক্ষকদের একজন ময়মনসিংহ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের শিক্ষক তাপস মজুমদার মনে করেন, শিক্ষকতা হলো একটি মহান পেশা, যেখানে সহজে মানুষকে ভালোবাসা যায়, আবার সহজে ভালোবাসাও পাওয়া যায়।
শিক্ষকদের পদোন্নতি-মর্যাদায় পিছিয়ে থাকার জন্য আক্ষেপ করেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক সহকারী শিক্ষক মো. শফিয়ার রহমান। তিনি বলেন, তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে একই পদে থেকে অবসরে গেছেন।
সৎ পথে চলার পরামর্শ দেন নোয়াখালীর খলিলুর রহমান উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ।
এবারের শিক্ষক সম্মাননার জন্য বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক পারভীন হাসান। তিনি বলেন, শিক্ষককে সম্মান জানানো এবং সম্মানিত করা মানে জাতিকে সম্মান জানানো।
বিচারকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. আবদুল হাকিম খান, সিলেট লিডিং ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মোস্তাক আহমদ, উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জহুরা বেগম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন।
শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দিতে হাজির হয়েছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আতিকুল ইসলাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ভিনসেন্ট চ্যাং, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মোফিজুর রহমান ও ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুর রব।
প্রথম আলো সংবাদপত্রের চেয়েও একটু বেশি উল্লেখ করে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। আমাদের সব কর্মকাণ্ড, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই—সেটা হলো আমরা সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজয় দেখতে চাই। সব ক্ষেত্রে সফলতা দেখতে চাই।’
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুব কার্যক্রম প্রধান মুনির হাসান। অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিশেষ নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেন প্রাচ্যনাট ও নিত্যরঙের সদস্যরা। অনুষ্ঠানের শুরুটা যেমন হয়েছিল ঘণ্টা বাজিয়ে, আবার শেষটাও হলো ঘণ্টা বাজিয়ে, যেন এবারের মতো স্কুল ছুটি হলো।