
বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে ময়মনসিংহ ‘শিক্ষানগরী’ হিসেবে পরিচিত। তবে নগরীতে ঢুকেই শিক্ষার্থীদের চরম আবাসন সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে নগরীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে ছাত্র ও ছাত্রীদের মেস। সেখানে শিক্ষার্থীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তার প্রশ্ন তো আছেই।
গত সপ্তাহে ময়মনসিংহ শহরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহর ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া গেল। শহরের অনেক বাড়ির সামনেই সাদা কাগজে লেখা আছে ছাত্রী বা ছাত্র মেস, সিট খালি আছে। অথবা সিট খালি নেই।
উইকিপিডিয়া থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলা গঠিত হয় ১৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দে। জেলা সদরের পত্তন হয় ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে। ময়মনসিংহ শহরের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সরকারি আনন্দমোহন কলেজ যাত্রা শুরু করে ১৯০৮ সালে। সরকারীকরণ করা হয় ১৯৬৪ সালে। ১৬ একর জায়গার মধ্যে অবস্থিত কলেজটিতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩২ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১৪ হাজারের বেশি ছাত্রী। ছাত্রীদের দুটি হোস্টেলে গণরুমসহ (১ রুমে ১৬, ১২ ও ৮ জন থাকছেন) ৪০০ জন শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে। নতুন দুটি হোস্টেল নির্মিত হচ্ছে। তাতেও খুব বেশি করে হলে ৪০০ শিক্ষার্থী থাকতে পারবেন। অন্যদের থাকতে হচ্ছে মেসে, নয়তো শহরের আশপাশ থেকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাসে করে এসে ক্লাস করে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে। ছেলেদের হোস্টেলেও ৪০০ জনের মতো আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক জাকির হোসেন বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক নিরাপদ। খরচও কম। কিন্তু কলেজে ভর্তির পর প্রথম বর্ষে হোস্টেলে সিট দেওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া এত এত শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করাও বাস্তবসম্মত নয়। আবাসন সংকটের ফলে কলেজের আশপাশের ৮০ শতাংশ বাড়িতেই ছাত্র বা ছাত্রীদের মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
আনন্দমোহন কলেজের হিন্দুধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা সুকান্ত ভট্টাচার্য ছাত্রাবাসে থাকছেন। জরাজীর্ণ এ ছাত্রাবাসের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘সারা বছরে এখানে সিট ভাড়া দিতে হয় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। খাবার খরচ আলাদা। আমাদের কলেজে ওয়াই-ফাই আছে। ঘণ্টা খানেক বৃষ্টি হলেই হোস্টেলের চাল দিয়ে তো পানি পড়েই, বাইরে থেকে পানি এসেও ঘরের মেঝে তলিয়ে যায়। মাঝেমধ্যে আমরা ঘরে সাপ ফ্রি পাই। ভূমিকম্প হলে ভয়ে থাকি ভবন ধসে পড়বে বলে। সকালে কমন টয়লেটে লাইন ধরে দাঁড়ানোর কথা আর না-ই বললাম।’
মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে মোট শিক্ষার্থী সাত হাজারের বেশি। কলেজে মোট দুটি হোস্টেল এবং একটি বর্ধিত ভবন আছে। একটি হোস্টেলে ১৪০ সিটে থাকছেন ১৭৭ জন। আরেক হোস্টেলে ১০৮ জনের থাকার কথা, সেখানে থাকছেন ২১৫ জন। টিনের চাল দেওয়া একতলা বর্ধিত ভবনে থাকার কথা ২০ জনের, সেখানে থাকছেন ৩৫ জন। কলেজের তাপসী রাবেয়া হলে গিয়ে দেখা গেল, একসময়ে বিনোদনকক্ষ বলে যে কক্ষ ছিল, তাতেও এখন ছাত্রীরা থাকছেন। বিনোদনকক্ষ থেকে টেলিভিশন ডাইনিংরুমে স্থানান্তর করা হয়েছে। হোস্টেলে লাইব্রেরি বা রিডিংরুম বলে কিছু নেই।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এন এম শাহজাহান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, এইচএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত কলেজে পড়ানো হচ্ছে। এইচএসসিতে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়েই আবাসন সংকটের মুখে পড়ে। হোস্টেলে সিটসংখ্যা কম হওয়ায় দুই সিটে তিনজন করেও থাকছেন। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এ সমস্যার কথা উল্লেখ করে তা সমাধানের জন্য অনেকবার আবেদন করা হয়েছে।
১৯৫৯ সালে যাত্রা শুরু করা মুমিনুন্নিসা কলেজ শিক্ষার্থীসংখ্যার দিক থেকে শহরে দ্বিতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজের হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের খাবার ছাড়া বছরে খরচ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। দিনে তিন বেলা খাবারের জন্য শিক্ষার্থীরা ব্যয় করছেন ৪০ টাকা।
শহরে ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কাঁচিঝুলি মোহামেডান গার্লস স্কুল। ১৯৪৩ সালে নামকরণ করা হয় মুসলিম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। ১৯৯৫ সাল থেকে এখানে কলেজ চালু হয়। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হচ্ছে। দুটি হোস্টেলে ২০০ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে।
শতবর্ষ উদ্যাপন করা প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, হোস্টেলে সিট দিতে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে চলতি মাসেই ১২ তলাবিশিষ্ট একটি হোস্টেল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর তৈরি করা হয়েছে।
বেসরকারি আলমগীর মনসুর মেমোরিয়াল কলেজে এইচএসসি থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত পড়তে পারছেন শিক্ষার্থীরা। ছেলে ও মেয়ে মিলে কলেজে মোট শিক্ষার্থী ১ হাজার ৫০০ জন। ছেলেদের জন্য দুটি হোস্টেল থাকলেও মেয়েদের জন্য কোনো হোস্টেল নেই। ভবন ভাড়া নিয়ে ছেলেদের জন্য দুটি হোস্টেল পরিচালনা করছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
কলেজের অধ্যক্ষ নীহার রঞ্জন রায় বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হোস্টেল নির্মাণ খাতে কোনো অনুদান নেই। বর্তমানে মেয়েদের জন্য কলেজের নিজস্ব অর্থায়নে হোস্টেল নির্মাণের চিন্তাভাবনা চলছে। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজের মোট জায়গার পরিমাণ ১৪২ শতাংশ।
বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৮৭৩ সালে। ১৯১২ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয়। ৩ দশমিক ৫২ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ে ১৯১২ সালেই একটি দ্বিতল ছাত্রীনিবাস তৈরি করা হয়। ১৯৯১ সাল থেকে এখানে দুই শিফটে ক্লাস হচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২ হাজার ১০৫। তবে এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা নাছিমা আক্তার বলেন, একসময় প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে ১০০ শিক্ষার্থী থাকলেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকেরা মেয়েদের হোস্টেলে রাখতে চাইছেন না। হোস্টেলে আপাতত ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকছেন।
ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ১৫৫টি। শুধু শহরেই আছে ৩৫টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সরকারের অনুমোদন ছাড়াও গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষানগরী বলা হলেও সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আবাসনের ব্যবস্থা অপ্রতুল। স্কুল পর্যায়ে ততটা না হলেও কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোস্টেল তৈরির দিকে নজর বাড়িয়েছে।
শহরে ছাত্রছাত্রী মেসের ছড়াছড়ি
শহরের অধিকাংশ বাসা হয় ছাত্রী মেস, না হয় ছাত্র মেস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হয়। মেসগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাড়িওয়ালাদের তেমন তৎপরতা নেই বলেই জানালেন বেশির ভাগ মেসের বাসিন্দারা।
মেসের বাসিন্দাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আনন্দ মোহন, মুমিনুন্নিসাসহ বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে বছরে সিট ভাড়া বাবদ খরচ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা, সেখানে যত নিম্নমানেরই হোক না কেন, মেসে মাসিক সিট ভাড়া এক হাজার টাকা। এর বাইরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খাবার, যাতায়াত ভাড়াসহ মাসেই খরচ হচ্ছে কয়েক হাজার টাকা। এইচএসসি পর্যায়ে গ্রাম থেকে শহরে এসেই একজন শিক্ষার্থীকে মেসের জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থী উম্মে সিনহা তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘তিনজন করে থাকবে শুনে রুমে গিয়ে দেখি সেখানে আসলে চারজনকে থাকতে হবে। বিছানা রাখলে আর নিচে পা ফেলারও জায়গা থাকে না। অগ্রিম টাকা দিয়েছিলাম, তা আর ফেরত পাওয়ার উপায় নেই জেনেও মেস ছেড়ে চলে আসি।’
আনন্দমোহন কলেজের শিক্ষার্থী মাহী হাসান কলেজের কাছে যে মেসে থাকেন, তার চাল টিনের। ঘরের পাশেই নোংরা ড্রেন। এখানেও সিট ভাড়া মাসে এক হাজার টাকা। তিনি জানালেন, ছাত্রীরা সহজে ফ্ল্যাট বাসা মেস হিসেবে ভাড়া নিতে পারলেও ছেলেদের অনেকেই ভাড়া দিতে চান না।
কিছু কিছু মেসে বলতে গেলে একেকজনের কেটে যাচ্ছে পুরো শিক্ষাজীবন। নব্বইয়ের দশকে শহরে মুষ্টিমেয় যে কয়টা মেস গড়ে ওঠে, সেগুলোর একটি হলো প্যারিসা-প্যালেস ছাত্রী মেস। ১৩ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে মেসে ১৪৭ জন ছাত্রী থাকছেন। এ মেসে থেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজছেন তামান্না জাহান। তাঁর মতে, শহরে মেসের অভাব নেই। কিন্তু সব জায়গায় নিরাপত্তা নেই। পরিবেশ ভালো না।