বাংলাদেশের শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা মোট ছবির সংখ্যা কত? কতটি তেলচিত্র? কতটি জলরং আর কতটি স্কেচ? কোন ছবি কোথায় আছে? এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব দেওয়া কঠিন। কেননা এখন পর্যন্ত এই শিল্পীর সামগ্রিক কাজের কোনো তালিকা করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া যে শিল্পকর্মগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার সংরক্ষণ পদ্ধতিও মানসম্মত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শিল্পাচার্যের প্রায় ৯০ ভাগ কাজ জাদুঘর ও তাঁর পরিবারের কাছে আছে। কাজেই প্রায় সামগ্রিক কাজের একটি ছাপা তালিকা বা পুস্তিকা করা কঠিন নয়। এটা জরুরি দুটো কারণে। প্রথমত এ থেকে গবেষকদের পক্ষে কাজগুলোর তথ্য ও পরিচিতি জানা সহজ হবে। দ্বিতীয়ত প্রায়ই শিল্পাচার্যের নামে যে নকল ছবি বাজারে আসে, তা বন্ধে এটি সহায়ক হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৪ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছিল শিল্পাচার্যের কাজের শ্রেণীকরণ ও তালিকা করে মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করার জন্য। তবে কাজটি সেভাবে এগোয়নি। কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর পরে শিল্পী হাশেম খানকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছিল জাদুঘরের সংগ্রহের ৮০৭টি কাজের শ্রেণীকরণ করার জন্য। সেই কমিটি কাজগুলোর চারটি ভাগ করেছে। এর মধ্যে ড্রয়িং ৪৭৬টি, জলরং ১১৩টি, মিশ্রমাধ্যম ৯০টি এবং বিবিধ ১২৮টি।
এ বিষয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিল্পাচার্যের সামগ্রিক কাজের তালিকা প্রকাশ করার পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন শিল্পাচার্যসহ প্রধান শিল্পীদের নিয়ে প্রত্যেকের ওপরে আলাদা করে বই করা হচ্ছে। শিল্পাচার্যের ওপরে বইটি প্রকাশ হয়েছে। শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক প্রকশনা হবে। বিদেশে, বিশেষ করে অনেক বাংলাদেশ দূতাবাসে শিল্পাচার্যের ছবি রয়েছে। কিছু ছবি খুব অযত্নের মধ্যে রয়েছে। আমরা সেগুলো দেশে এনে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করছি। দূতাবাসের দেয়াল যেন খালি না থাকে, সে জন্য অন্য শিল্পকর্ম পাঠানো হবে।’
শিল্পাচার্যের ১০৩তম জয়ন্তী আজ। ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের কেন্দুয়ায় তাঁর জন্ম ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর। দীর্ঘ জীবন তিনি পাননি। মাত্রই ৬২ বছর বয়সে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে লোকান্তরিত হন এই মহান শিল্পী।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাজের সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ রয়েছে জাতীয় জাদুঘরে। জাদুঘরের তৃতীয় তলায় ৩৫ নম্বর গ্যালারি সম্পূর্ণ সাজানো হয়েছে শিল্পাচার্যের কাজ ও তাঁর ব্যবহৃত ছবি আঁকার উপকরণ দিয়ে।
জাদুঘরের সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিভাগের কিপার বিজয়কৃষ্ণ ভৌমিক ও উপকিপার শক্তিপদ হালদার জানান, জাদুঘরের অন্তর্ভুক্ত ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য সংগ্রহশালাতেও রয়েছে শিল্পাচার্যের ৬২টি শিল্পকর্ম। এখানে ১৯৪৩ সালে তাঁর আঁকা দুর্ভিক্ষের সেই কালজয়ী ড্রয়িং আছে ৭টি। এ ছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে আঁকা কাজের মধ্যে আছে সাঁওতাল দম্পতি, গুনটানা, বিদ্রোহ, ঝড়, মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীসহ মোট ৪৫টি শিল্পকর্ম। চারটি তুলি-প্যাচুলা মিলিয়ে ৪৯টি নিদর্শনও প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব ছবির ডিজিটাল ইমেজ দেখার ব্যবস্থা রয়েছে।
শিল্পকলা একাডেমির সংগ্রহ সামান্য। একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক মুনিরুজ্জামান জানান, তাঁদের কাছে শিল্পাচার্যের শিল্পকর্ম রয়েছে মাত্র চারটি। অনেক আগে তাঁরা দুর্ভিক্ষের ১৬টি ড্রয়িং দিয়ে একটি ফোলিও এবং অধ্যাপক ও শিল্পসমালোচক নজরুল ইসলামের লেখা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন নামের একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। এগুলো অনেক বছর আগে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
শিল্পাচার্যের কাজ নিয়ে দেশে উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গন ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ১ ও ২’ নামে ১৯৯৩ সালে দুটি ফোলিও প্রকাশ করেছিল। এতে ছিল তাঁর ৪০টি শিল্পকর্মের ছবি।
তবে শিল্পাচার্যের কাজ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে। বেঙ্গল পাবলিকেশন ইতালির বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা স্কিরার সঙ্গে যৌথভাবে বইটি করে। এই বই ছাপা, বাঁধাই সবই হয়েছে ইতালিতে। স্কিরা সারা বিশ্বে বইটি বিপণন করছে। এতে কলানুক্রমিক বিন্যাসে ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত শিল্পাচার্যের আঁকা ২৭০টি কাজের ছবি ও আনুষঙ্গিক তথ্য সংযোজিত হয়েছে।
অধ্যাপক নিসার হোসেন বলেন, জাদুঘরে যেভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। কক্ষটি অগ্নিরোধক নয়। আর ময়মনসিংহের ছবিগুলো রয়েছে অযত্নে। তাতে ছত্রাক পড়ে যাচ্ছে।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি কামরান পারভেজ জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার মূল সংগ্রহকক্ষে ঢুকে দেখা যায়, এক পাশের দেয়ালে শেওলা জমে আছে। সংগ্রহশালার উপ-কিপার মুকুল দত্ত বলেন, সংগ্রহশালার ভবনটির বয়স ১০০ বছরের বেশি। তাই পশ্চিম পাশের দেয়াল বেশির ভাগ সময় ভেজা থাকে।
সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ছবিগুলোর সংরক্ষণ পদ্ধতি আরও উন্নত করা এবং এ জন্য দক্ষ জনবল তৈরির জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জয়নুল উৎসব
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ জয়নুল উৎসবের আয়োজন করছে। সকাল সাড়ে আটটায় শিল্পাচার্যের সমাধিতে পুষ্পস্তবক নিবেদনের ভেতর দিয়ে উৎসব শুরু হবে। বকুলতলার মঞ্চে সকাল দশটায় উদ্বোধনী সংগীত। প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠানে আলোচনার ছাড়াও থাকবে জয়নুল সম্মাননা প্রদান ও জয়নুল মেলা।