ইলিয়াস কাঞ্চনের সাক্ষাৎকার

সচেতন হলেই ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব

ইলিয়াস কাঞ্চন
ইলিয়াস কাঞ্চন

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ মানুষের অসচেতনতা—এমনটাই মনে করেন নিরাপদ সড়ক চাইয়ের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর ২৪ বছর ধরে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলন করছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুশফেকা ইসলাম

প্রথম আলো: দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো কী?
ইলিয়াস কাঞ্চন: প্রতিটি দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কিছু আলাদা কারণ কাজ করে। সৌদি আরবে গরম আবহাওয়ার কারণে চালকদের ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া বা গরম বাতাসের চাপে চাকা ফেটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশেও অনভিজ্ঞতা, ট্রাফিক আইন না মানার পাশাপাশি চালকদের ক্লান্তি বা পথের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। বেশি আয়ের লোভে অনেক ক্ষেত্রে চালকেরা দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়ে গাড়ি চালান। এতে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

প্রথম আলো: এ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে কী করা যায়?
ইলিয়াস কাঞ্চন: যাত্রীরা সতর্ক হলে এই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। সচেতনতা এ ক্ষেত্রে ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা কমাতে পারে। চালকের শরীরী ভাষা লক্ষ করেই একজন যাত্রী বুঝতে পারবেন চালক ক্লান্ত কি না। যেমন: চালক যদি ক্লান্ত থাকেন বা তাঁর ঘুম পায়, তাহলে প্রথমেই তিনি ডান-বাঁয়ে ঘাড় নাড়িয়ে ঝিমুনি কাটাতে চেষ্টা করবেন। তার পরের ধাপে ঘাড়ের এক পাশে হাত দিয়ে চাপ দিতে থাকবেন। এরপর যদি চালক হাত মুঠো করে নিজের চুল টানতে থাকেন, তখন বুঝতে হবে তিনি আর জেগে থাকতে পারছেন না। তখন সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি বা বাস রাস্তায় থামিয়ে দিতে হবে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে, চা-কফি খেয়ে অন্তত আধা ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে চালককে। এভাবে বিশ্রামের সুযোগ পেলে চালক পরবর্তী দু-তিন ঘণ্টা সুস্থির-সজাগ থেকে গাড়ি চালিয়ে নিতে পারবেন।

প্রথম আলো: দুর্ঘটনা এড়াতে যাত্রীরা আর কী করতে পারেন?
ইলিয়াস কাঞ্চন: আমাদের দেশের যাত্রীদের কিছু আচরণের পরিবর্তন দরকার। দূরপাল্লার ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমরা বাড়ি থেকেই ভেবে আসি যে বাসে উঠেই ঘুম দেব। যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তখন এই ঘুমন্ত যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমাদের দেশে খুব কম মানুষই সিটবেল্ট ব্যবহার করেন। গণপরিবহনে সিটবেল্টের ব্যবস্থাও সব সময় থাকে না। তাই গাড়ি জোরে ব্রেক করলে বা সংঘর্ষ হলে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রী ছিটকে পড়ে আঘাত পেতে পারেন। পানিতে গাড়ি পড়ে গেলে কিছু বোঝার আগেই তলিয়ে যেতে পারেন। দুর্ঘটনা এড়াতে যাত্রীদের উচিত জেগে থেকে চালকের আচরণ লক্ষ করা।
আবার অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরাই চালককে উত্ত্যক্ত করেন। দ্রুত চালাতে জোর করেন। স্টপেজ ছাড়া যেখানে-সেখানে গাড়ি থামাতে বলেন। তাঁদের মনে রাখতে হবে, সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। এ ধরনের আচরণ থেকে তাঁদের সরে আসতে হবে।

প্রথম আলো: সচেতনতা তৈরি করতে সরকার কীভাবে কাজ করতে পারে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: সরকার প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ প্রসঙ্গে জনবলের স্বল্পতার কথা বলে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই অজুহাত দেওয়ার সুযোগ নেই। ‘ডেস্ক ক্যাম’ নামে একটি ডিভাইস আছে, যেটি গাড়িতে স্থাপন করে চালকের আচরণ পর্যবেক্ষণ (মনিটর) করা যায়। যাত্রী গাড়িতে বসে পর্দায় আর গাড়ির মালিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফোনে-কম্পিউটারে চালকের গতিবিধি, গাড়ির গতি, ব্রেকের গতি—এসব বিষয়ে নজর রাখতে পারেন।
খুব অল্প খরচে সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েও ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ গাড়ির গতির ওপর নজর রাখতে পারে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীকে জরিমানার আওতায় আনতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো, জরিমানার অর্থ গাড়ির মালিক নয়, চালকের পরিশোধের নিয়ম করতে হবে। তাহলে চালকেরা বেশি সতর্ক থাকবেন।
আর সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন জনপ্রতিনিধিরা। তাঁরা নিজ এলাকায় গিয়ে অনেক বিষয়েই কথা বলেন, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে সতর্কতা তৈরিতে তাঁদের কোনো কাজ দেখি না। তাঁরা যদি নিজেদের এলাকার মানুষকে বুঝিয়ে রাস্তায় হাটবাজার বসা, গরু-ছাগল বেঁধে রাখা, ধান শুকানো—এসব কাজ বন্ধ করতে পারেন, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ রোল মডেল হতে পারবে।
আর যে উদ্যোগটি সরকারকে নিতে হবে তা হলো, ফুটপাত ও পদচারী-সেতু বাদ দিয়ে রাস্তায় হাঁটাচলা বন্ধে আইন করে উচ্চ জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রথম আলো: অন্যান্য অংশীজনের (স্টেকহোল্ডার) ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
ইলিয়াস কাঞ্চন: সড়ক দুর্ঘটনা কোনো একক বিষয় নয়। অনেক কারণ এর সঙ্গে জড়িত। তাই এটা বন্ধের উদ্যোগও সবাই মিলে নিতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে আমাদের গণমাধ্যমগুলো এমনিতেই অনেক সোচ্চার। এটা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণির মানুষেরাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। তাঁরা তো আর পত্রিকা পড়েন না বা খবর দেখেন না। এ ক্ষেত্রে কারখানার মালিকদের উচিত তাঁদের কর্মচারীদের সতর্ক করা। গাড়ির মালিকদেরও তাঁদের চালকদের বিশ্রাম-সুস্থতার দিকে নজর রাখতে হবে। আর যাত্রীদের উচিত চালকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে তাঁদের বুঝিয়ে বলা। চালকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখলে লাভ হবে না। যাত্রীরা যদি প্রতিদিন চালকদের সুন্দর করে সড়কে ঝুঁকির কথা, আইন মেনে চলার গুরুত্বের কথা বুঝিয়ে বলেন, তাহলে অবশ্যই পরিবর্তন আসবে।

আরও পড়ুন:
ঢাকায় নিহতদের ৭২% পথচারী

ঘণ্টায় ২০ জন হাসপাতালে ভর্তি

সচেতন হলেই ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব