চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

সবাই মিলে 'মিড ডে মিল'

এসব হাঁস পালন করেই ঠাকুরগাঁওয়ের চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিড ডে মিলের (দুপুরের খাবার) ব্যবস্থা হয়। ছবিটি বিদ্যালয়-সংলগ্ন পুকুর থেকে গত সপ্তাহে তোলা l প্রথম আলো
এসব হাঁস পালন করেই ঠাকুরগাঁওয়ের চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিড ডে মিলের (দুপুরের খাবার) ব্যবস্থা হয়। ছবিটি বিদ্যালয়-সংলগ্ন পুকুর থেকে গত সপ্তাহে তোলা l প্রথম আলো

ঢং ঢং শব্দে বেজে উঠল ছুটির ঘণ্টা। শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে এল শিক্ষার্থীর দল। কেউ ছুটল পুকুরঘাটের দিকে, কেউ পেঁপেবাগানে। শিক্ষকেরাও দুই ভাগ হয়ে যোগ দিলেন ওদের সঙ্গে।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বকুয়া ইউনিয়নের চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এটা। গত বুধবার দুপুরের দিকে ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, খাবারের থালা নিয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ‘টাস, টাস...’ শব্দ তুলে ডাকতে শুরু করছে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে পুকুরে ভেসে থাকা হাঁসের ঝাঁক উঠে আসছে পাড়ে। শিক্ষার্থীরা থালার খাবার দিল আর খেতে শুরু করল হাঁসের দল। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ খাবার সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া হাঁসকে খাবার পেতে সাহায্য করছে। খাবার শেষে হাঁসগুলো আবার ফিরে গেল পুকুরে।
হাঁসের খাবার নিয়ে ব্যস্ত বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছাম্মৎ হিমু জানায়, বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ফাঁকে তারা প্রতিদিন একদল খাবার দেয় হাঁসকে, অন্য দল পেঁপেবাগানের পরিচর্যা করে। এই কাজ করতে এখন ওদের গর্বই হয়।
পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী শিউলি আকতার বলে, ‘সমাপনী পরীক্ষার পর স্কুল ছেড়ে চলে যাব। স্কুলের জন্য ভালো কিছু একটা করে যেতে পারলে নিজেরও ভালো লাগবে।’
১৬০টি হাঁসের এই খামার বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যই। প্রতিদিন গড়ে ৯০ থেকে ১০০ ডিম দেয় হাঁসগুলো।
পাশের পেঁপেবাগানে গিয়ে দেখা গেল, শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত বাগানের আগাছা পরিষ্কারে। নিড়ানির পর গাছের গোড়ায় পানি দিচ্ছিল কেউ কেউ। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজানা আকতার বলল, ‘একটা ভালো উদ্দেশ্যে সবাই মিলে এ কাজ করছি আমরা। স্যাররা আমাদের সাহায্য করছেন।’
সেই ভালো উদ্দেশ্যটি কী? তা হলো—বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার (মিড ডে মিল)। বিদ্যালয়ে ঝরে পড়া রোধে এই কর্মসূচি সরকারিভাবে দেশের প্রতি উপজেলার একটি করে বিদ্যালয়ে চালু করা হয়। কিন্তু আস্তে আস্তে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। হরিপুর উপজেলায়ও তাই হয়েছে। নতুন হওয়ায় চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই প্রকল্প পায়নি। কিন্তু প্রধান শিক্ষক এরফান আলী তাঁর বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করতে চাইলেন। ছুটে গেলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। খালি হাতে ফিরে এলেন, তবে আশা ছাড়েননি তিনি।
এরফান আলীর কর্মতৎপরতায় ঢোকার আগে বিদ্যালয়টি সম্পর্কে কিছু জেনে নিই। ২০০১ সালে এরফান আলীর বাবা মো. নুরুল ইসলাম নিজে জমি দিয়ে চরভিটা গ্রামে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। ২০১৩ সালে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৭৬ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। দুজন শিক্ষিকাসহ শিক্ষক আছেন চারজন।
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার চরভিটা এলাকাটি দারিদ্র্যপ্রবণ। অধিকাংশই খেটে খাওয়া মানুষ। অভাব-অনটনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে খুব একটা হাজির হতো না। ২০১৩ সালেও চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫০ শিক্ষার্থী ছিল, কিন্তু প্রতিদিন হাজির থাকত ৬০ থেকে ৭০ জন। বিষয়টি নিয়ে ভাবনায় পড়লেন প্রধান শিক্ষক এরফান আলী।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা এবং ঝরে পড়া রোধে নিজেই উদ্যোগ নিলেন এরফান আলী। উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় তাঁকে বিমুখ করলেও দমে যাননি তিনি। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা ডাকলেন। পড়ালেখায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানালেন তাঁদের। প্রধান শিক্ষকের পরিকল্পনায় সবাই সম্মতি দিলেন। এরপর কাজে নেমে পড়লেন এরফান আলী। বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে তাঁর উদ্যোগের কথা জানালেন। গ্রামবাসী পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন।

মিড ডে মিল পরিদর্শনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশন করছেন জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস। সঙ্গে আছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এরফান আলী (ডানে) l প্রথম আলো

এরফান আলী জানান, বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযুক্ত সব শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা, প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়া রোধে বর্তমান সরকার মিড ডে মিল কর্মসূচি চালু করেছিল। ২০১১-২০১২ সালের দিকে জেলার প্রতিটি উপজেলায় যেকোনো একটি সরকারি বিদ্যালয়কে স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। পরবর্তী সময়ে কমিউনিটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে একের পর এক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ অনেক চেষ্টা করেও কোনো বিদ্যালয়ে নতুন করে কর্মসূচিটি চালু করতে পারেনি।
কিন্তু এরফান আলী গ্রামের লোকজনকে নিয়ে দরিদ্র এই এলাকার স্কুলে মিড ডে মিল চালু করলেন। প্রতি মাসে এর জন্য ৩০ থেকে ৩৩ হাজার টাকা খরচ লাগে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকায় মাসে মাসে এত টাকার জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। এই অবস্থায় স্থায়ী আয়ের কথা ভাবলেন প্রধান শিক্ষক। এই উদ্যোগ চালু রাখতে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. নুরুল ইসলাম নিজের ছয় বিঘার একটি পুকুর ও এক বিঘা জমি সাময়িকভাবে বিদ্যালয়কে ব্যবহার করতে দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি নিজের দোকান থেকে প্রতি মাসের লবণ ও তেলের জোগান দেন। বকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের, ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি মো. কলিমউদ্দিনসহ গ্রামের আরও অনেকে বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল কর্মসূচি টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসেন।
সেই পুকুরেই চলছে হাঁসের চাষ। আর দুই বিঘা জমিতে পেঁপে। প্রধান শিক্ষক জানালেন, এই দুই খাত থেকে মাসে ১৫ হাজার টাকার মতো আয় হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির নিচের শিক্ষার্থীদের সকালে এবং তার ওপরের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাবার দেওয়া হয়। সপ্তাহে তিন দিন দেওয়া হয় খিচুড়ি, সঙ্গে একটি করে ডিম। খিচুড়ি তৈরির জন্য দিনে চাল লাগে ২৪ কেজি। সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন বাড়ি থেকে মুঠো চাল নিয়ে আসে। সপ্তাহের বাকি তিন দিন দেওয়া হয় পাউরুটি, সঙ্গে কলা বা ডিম। ডিম অবশ্যই বিদ্যালয়ের খামারের।
হাজিরা খাতা দেখিয়ে এরফান আলী বলেন, মিড ডে মিল চালুর আগে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল অর্ধেকের কম। এখন সব শ্রেণিতেই ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। চলতি বছরের সমাপনী পরীক্ষায় কমপক্ষে ১০ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাবে বলে আশা করছেন তিনি।
চরভিটা গ্রামের মৎস্যজীবী হাসান আলীর মেয়ে রুবাইয়া আকতার বলল, ‘অনেক সময় খেয়ে না-খেয়ে দিন কেটেছে। ক্ষুধা পেটে নিয়ে স্কুলে আসা হতো না। পড়ালেখায় মনোযোগ থাকত না। এখন স্কুলে খাবার পাই। ভালো লাগে।’ এবার সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাবে বলে আশা রুবাইয়ার।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুর আলম বলল, ‘স্কুলে দুপুরের খাবার না পেলে আমার হয়তো স্কুলেই আসা হতো না। স্কুলের খাবার খেয়ে আমরা এখন নিশ্চিন্তে পড়ালেখা করতে পারছি।’
বকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, ‘আমার জানামতে, রংপুর বিভাগে আর কোনো বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের এমন কর্মসূচি চালু নেই। আমরা সমন্বিতভাবে এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) মো. আবু হারেস বললেন, কমিউনিটির (স্থানীয় জনগণ) সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেই যেকোনো কর্মসূচি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড ডে মিল কর্মসূচি সচল রেখে তাঁরা সেই উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।’ তিনি জানান, এ বিদ্যালয়টি জেলার একমাত্র বিদ্যালয়, জন-অংশগ্রহণের মাধ্যমে যেখানে মিড ডে মিল কর্মসূচি সচল আছে।
স্থানীয় উদ্যোগে মিড ডে মিল কর্মসূচি সচলের কথা শুনে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনের পর অবকাঠামো নির্মাণে চার টন চাল বরাদ্দ করেন। ওই অনুদান দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি টিনশেড ঘর।
মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে উদ্যোগের সঙ্গে জনগণ সম্পৃক্ত থাকে, তা কখনোই ব্যর্থ হয় না। চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগকে উদাহরণ হিসেবে সামনে রেখে জেলার সব উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের কর্মসূচি চালু করতে পরিকল্পনা নিচ্ছি আমরা।’
গত বুধবার বিদ্যালয়ে যখন কথা হচ্ছিল, তখন প্রধান শিক্ষক এরফান আলী বললেন, ‘স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলেমিশে হাঁস পালন করে এবং পেঁপেবাগানের আয় থেকে মিড ডে মিল কর্মসূচি টিকিয়ে রাখছি। এখন হাঁস ডিম দেওয়া বন্ধ করেছে। পেঁপেবাগানের ফলনও কমে এসেছে। তাই কর্মসূচির খরচ জোগাতে একটু কষ্ট হচ্ছে। তবে এলাকার লোকজন সঙ্গে থাকলে সংকট অবশ্যই কেটে যাবে।’ কথা শেষ করে পেঁপেবাগানের দিকে চলে গেলেন এরফান আলী। জানালেন, শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত রাখতে ‘আমরা করবো জয়’ গানটি নিয়ম করে গাওয়া হয় তাঁর বিদ্যালয়ে। কথা শেষ করে পেঁপেবাগানের দিকে যেতে যেতে গুনগুন করে নিজেই গাইতে লাগলেন:
‘আমরা করবো জয়!
আমরা করবো জয়! একদিন...।’
প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে পেঁপেবাগানে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও গলা মেলাল
‘...বুকের গভীরে আছে প্রত্যয়
আমরা করবো জয়! একদিন...।’