ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে নানা আলোচনা আছে। ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে কি না, তা নিয়েও তর্কবিতর্ক কম নয়। এসব বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমাম হোসেন সাঈদ।

চিন্তা, নিয়মনীতি, গবেষণা আর সৃজনশীল চর্চায় এখন স্থায়ী ধর্মঘট চলছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে প্রায় দুই বছর আগে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই নয়জন শিক্ষক। এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে কি আপনি একমত?
আখতারুজ্জামান: তাঁদের মন্তব্য অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়, সে কারণে তাৎক্ষণিকভাবে একে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের মন্তব্য বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত, কর্মপ্রয়াস, বহু প্রক্রিয়া-পদ্ধতির মধ্য দিয়ে বহুজনের অংশগ্রহণে করতে হয়। এখানে নিয়মনীতি উপেক্ষিত হয়, এটি বলা বড় কঠিন। কখনো কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ব্যত্যয় হতে পারে—এ বিষয়ে বেশি দ্বিমত করছি না। যেসব সহকর্মী বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতায় স্থায়ী ধর্মঘট চলছে, তাঁরা নিজেরা হয়তো কখনো জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে ধর্মঘটে যাননি। তাঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করছেন। তবে তাঁরাও যদি গিয়ে থাকেন, তাহলে আমার বলার বেশি কিছু নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জ্ঞানচর্চা ও গবেষণাকে জোরদার করার তাগিদ খুব গভীরভাবে অনুভব করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, মৌলিক, প্রায়োগিক ও বাস্তবধর্মী গবেষণা ও উদ্ভাবনে আমরা পিছিয়ে আছি। এই পিছিয়ে থাকার পেছনে অনেকগুলো শক্তিশালী যুক্তি আছে। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আগে খুব ভালো মৌলিক–প্রায়োগিক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার ফল প্রত্যাশা করাটা কঠিন বিষয়।
জ্ঞানচর্চায় সহযোদ্ধা-ছাত্র-শিক্ষকদের এই সম্পর্ক ছাপিয়ে এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়ে উঠছে দলীয় রাজনৈতিক সহযোদ্ধা।
আখতারুজ্জামান: সমাজে একটি চিন্তার ধারা আছে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে রাজনীতিবিমুক্ত। এই ধারা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করে কিছু মন্তব্য-বক্তব্য দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শক্তিশালী অবদান হলো সমাজে জ্ঞানদীপ্ত, বুদ্ধিদীপ্ত, রাজনীতিমনস্ক ও সমাজসচেতন গ্র্যাজুয়েট (স্নাতক) তৈরি করা। শুধু শ্রেণিকক্ষ নয়, ক্যাম্পাসের প্রতিটি অঙ্গ-স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান এই শিক্ষা দেয়। রাজনীতির চর্চা হবে, তবে সহিংসতার নয়।
অন্ধ দলীয় রাজনীতির জন্য মুক্তচিন্তা আর বিবেকের স্বচ্ছতাকে বিসর্জন দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, এমন অভিযোগও রয়েছে।
আখতারুজ্জামান: ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একটি জরুরি বিষয়। এটি না থাকলে সমাজ বিকশিত হয় না। এসব মতকে একেবারে অবজ্ঞা করব না। তবে এসব বক্তব্যে বস্তুনিষ্ঠতা কতটুকু আছে, সেটি দেখতে হবে। সমালোচক বন্ধুদের আমি ধন্যবাদ দিই। তাঁরা আমাদের সংশোধনের সুযোগ দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কখনো অন্ধবিশ্বাসের জায়গা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তচিন্তা ও বিতর্কের জায়গা।
দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগ এবং শিক্ষক নিয়োগে দলীয় বিবেচনা মুখ্য হয়ে ওঠায় ক্ষমতার সেবা করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বড় কাজ হয়ে উঠছে কি?
আখতারুজ্জামান: দলীয় বিবেচনায় কোনো শিক্ষক নিয়োগ হয় না, হয় মেধার ভিত্তিতে। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে সব সময় একটি বিষয়টি কাজ করে যে সেরা ছাত্রটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবে। এটি আমি খুব শক্তভাবে ধারণ করি।
কোন বিবেচনায় কীভাবে উপাচার্য নিয়োগের কাজটি করা হয়, এর উত্তর সরকারপক্ষই ভালো বলতে পারবে। কারণ, উপাচার্য নিয়োগ পেতে দরখাস্ত করেন না। কিন্তু যখন কেউ উপাচার্য পদে নিয়োগ লাভ করবেন, তখন তিনি আর ব্যক্তি নন, প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী। আইন অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনাই প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে উপাচার্যের কাজ। এর কোনো ধরনের ব্যত্যয় একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত।