নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ আইনজীবীরা বলেছেন, সরকার নিজেই আইন ভঙ্গ করে ড্যাপ সংরক্ষিত এলাকায় জলাভূমি, বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল ভরাট করে আবাসিক প্রকল্প অনুমোদনের সুপারিশ করছে। অবিলম্বে আইনের এই বরখেলাপ বন্ধ করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্ল্যানার্স টাওয়ার মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ আইনজীবীরা বলেন, জনস্বার্থ উপক্ষো করে গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার জন্য ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অগ্রাহ্য করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সুপারিশ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাতিল করা না হলে ঢাকা মহানগরের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। মহানগর বসবাসের উপযোগিতা হারাবে।
ড্যাপ অগ্রাহ্য করে ভূমি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সুপারিশের প্রতিবাদে যৌথভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স, ইনস্টিটিউট অব আরকিটেক্টস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি ও সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ।
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন। লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন আক্তার মাহমুদ। আলোচনা করেন খন্দকার এম আনসার হোসেন, সাঈদ আহমেদ, গোলাম রহমান, সালমা এ শফি ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সঞ্চালনা করেন ইকবাল হাবিব।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ২০১০ সালে প্রণীত ড্যাপ কেবল জনগণের চাহিদা পূরণের জন্য প্রণীত টেকসই উন্নয়নের সরকারি দলিলই নয়, এর আইনগত ভিত্তি ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আইনের ব্যত্যয় করা যায় না। পাশাপাশি ২০০০ সালের ‘মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জোলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সকল পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’-এ স্পষ্ট করে বলা হয়েছ, এই আইনের বিধান ছাড়া উল্লিখিত চিহ্নিত জায়গার পরিবর্তন করা যাবে না। অথচ সম্প্রতি ড্যাপ সংশোধনের নামে সংরক্ষিত বন্যাপ্রবাহ এলাকায় কিছু হাউজিং প্রকল্পকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। চলতি বছরের গত মে মাসে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের মধ্যবর্তী এলাকায় ‘জলসিড়ি আবাসন’, টঙ্গীর তুরাগ নদের পাশে ‘প্রত্যাশা হাউজিং’ এবং কুড়িল-পূর্বাচল ৩০০ ফুট রাস্তার দুপাশে ‘পুলিশ হাউজিং’-এর নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করেছেন। এ ছাড়া কুড়িল-পূর্বাচল ৩০০ ফুট রাস্তার পাশে ড্যাপ প্রস্তাবিত ১০০ ফুট পানি প্রবাহমান এলাকা (ওয়াটর রিটেনশ এরিয়া) বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি জুন মাসের ৪ তারিখে ড্যাপ রিভিউ কমিটির সভায় আরও ১৯টি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ড্যাপ প্রস্তাবিত ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি পরিবর্তন করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কেরানীগঞ্জ এলাকার ‘প্রিয়প্রাঙ্গণ’ ও ‘বসুন্ধরা বারিধারা’। গত ২৫ আগস্ট ড্যাপ রিভিউ কমিটির সভায় বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি লিমিটেডের (বসুন্ধারা গ্রুপ) তিনটি, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের তিনটি ও বিডিজির দুটি প্রকল্প অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। অথচ এ ধরনের ৭৫টি হাউজিং প্রকল্প ২০১১ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট বেআইনি ঘোষণা করেছিল।
সংবাদ সম্মেলনে আলোচকেরা বলেন, সরকার যে প্রক্রিয়ায় এসব প্রকল্পের অনুমোদ দিচ্ছে বা সুপারিশ করছে, তা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত, জনস্বার্থবিরোধী। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব দেওয়া হচ্ছে। সরকার নিজেই নিজের আইন ভঙ্গ করে এ পর্যন্ত অর্জিত সাফল্যকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা ড্যাপ বাস্তবায়ন ও ড্যাপকে ঢাকার উন্নয়নের ভিত্তি দলিল হিসেবে গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে সব উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেন।