
দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছেই। গত ছয় মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দিনে প্রায় ছয়টি হত্যা, খুন, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণসহ সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। অপরাধ বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সামাজিক অস্থিরতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও বিকৃত মানসিকতার চর্চায় অভ্যাসগত অপরাধ শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
শিশুর প্রতি বীভৎস সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রামে। বাড়ির অদূরে কদমগাছের ডাল থেকে সাড়ে পাঁচ বছর বয়সের শিশু তুহিন মিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুই কান কাটা ছিল। পেটে ঢোকানো ছিল দুটি ছুরি। নির্মমতার এখানেই শেষ নয়।
তার যৌনাঙ্গটিও কেটে নেওয়া হয়েছিল। পরে মায়ের করা মামলায় শিশুটির বাবা আবদুল বাছির, চাচা নাসির মিয়া ও তাঁর ছেলে শাহরিয়ারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
প্রতিপক্ষের লোকজনকে ফাঁসাতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান তাঁরা।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত শিশুর প্রতি ১ হাজার ৩৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দৈনিক প্রায় ছয়টি ঘটনা। গত বছরের মার্চ থেকে করোনা সংক্রমণের কারণে মানুষের চলাচল ও কার্যক্রম সীমিত ছিল। তবু বছরের প্রথম ছয় মাসে সহিংসতার সংখ্যা ছিল ৯৭৭টি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০১৯ সালে সহিংসতার ঘটনা ছিল ২ হাজার ১৮৪টি। আগের বছর ২০১৮ সালে যা ছিল ১ হাজার ৫৩২টি।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মূল্যবোধের অভাব তথা নীতিহীনতা শিশুর প্রতি সহিংসতার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রেণি বিভাজনের কারণে বৈষম্য বাড়ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অন্যতম নিয়ামক হচ্ছে বৈষম্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, শিশুর প্রতি যে সহিংসতা হয়ে আসছে, তা আরও বাড়বে। সঠিক উদ্যোগ না নিলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে থাকবে।
পত্রিকায় যতটুকু আসে, মূল ঘটনা তার চেয়েও ভয়াবহ। করোনার সময় বিকৃত মানসিকতারও মহামারি চলছে।সালমা আলী, সভাপতি, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
সামাজিক অস্থিরতার কারণে কুষ্টিয়ায় চলতি বছরের ১৩ জুন প্রাণ দিতে হয় চার বছরের শিশু তুহিনকে। শহরের কাস্টমস মোড়ে মায়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার সময় প্রকাশ্যে তার মা আসমা খাতুন ও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একই এলাকার বাসিন্দা শাকিল হোসেনকে গুলি করে হত্যা করেন পুলিশের উপপরিদর্শক সৌমেন রায়। ঘটনার আকস্মিকতায় ভয় পেয়ে দৌড় দিলে তুহিনকে জাপটে ধরে গুলিতে হত্যা করেন সৌমেন। গ্রেপ্তারের পর নিহত নারীকে নিজের স্ত্রী দাবি করেন সৌমেন।
অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রাপ্তবয়স্কদের ভুলে প্রাণহানি ঘটে নিষ্পাপ শিশুদের। মাদক ও প্রযুক্তির অভিশাপে মূল্যবোধের অবক্ষয়কে এসব ঘটনার কারণ বলা হলেও নজরদারির অভাবকে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলছেন তাঁরা।
জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কর্মী সালমা আলী বলেন, পত্রিকায় যতটুকু আসে, মূল ঘটনা তার চেয়েও ভয়াবহ। করোনার সময় বিকৃত মানসিকতারও মহামারি চলছে।
দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গত পাঁচ বছরে ৩০ হাজার ২৭২টি মামলা হয়েছে। এ হিসাব গত বছরের ২১ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত পাঁচ বছর সময়ের। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য এসেছে।
আইনজীবীরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে নারী ও শিশু নিপীড়ক পার পেয়ে যায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিপীড়নের শিকার হওয়ার পরও বিচার চান না। এ ছাড়া নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর পুলিশসহ বিচারব্যবস্থায় এখনো ভিকটিমকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি বিচারহীনতার অন্যতম কারণ বলছেন আইনজীবীরা।
সালমা আলী বলেন, ‘আমরা আইন পরিবর্তনের কথা বলে আসছি। কিন্তু দেশের বিচারপ্রক্রিয়ায় ধর্ষণের শিকার শিশু ও নারীকেই নানাভাবে দোষারোপ করা হয়।
মানসিকতার পরিবর্তন না করলে, আইন পরিবর্তন করে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না।’
যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর নিজেকেই ‘খারাপ মেয়ে’ উল্লেখ করে মায়ের কাছে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করে বরগুনার এক স্কুলছাত্রী। গত ৫ মে লাশ উদ্ধারের পর ওই মেয়ে যে বাড়িতে থাকত, সে বাড়ির মালিকের ছেলেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
৭০ শতাংশ শিশু-কিশোরী যৌন নির্যাতনের শিকার
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক উমর ফারুক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, দেশের ৫ থেকে ১২ বছরের শিশু-কিশোরীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার। এ ছাড়া স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের ৬৫ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। দুই ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনকারীরা পরিবারের নিকটাত্মীয়, যা প্রকাশ হয় না।
অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, শিশুর প্রতি সহিংসতার মতো অপরাধ অভ্যাসগত হয়ে গেছে। এই অপরাধীরা বিকৃত আচরণের মাধ্যমে আনন্দ পেয়ে থাকে।
অপরাধবিজ্ঞানের এই শিক্ষক মনে করেন, সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুকে ক্ষতিপূরণ দিতে আইনি কাঠামো ছাড়াও অপরাধ দমনে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করার ওপর জোর দেন তিনি।