ইউপির জনপ্রতিনিধিদের মত

সীমাবদ্ধতা দূর হলে শক্তিশালী হবে ইউনিয়ন পরিষদ

আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা এর নিজস্ব জনবল না থাকা। এ ছাড়া পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সচিব ও চৌকিদারদের বেতন বা সম্মানী নামমাত্র হওয়ায় তাঁদের মধ্যে সার্বক্ষণিক কাজ করার আগ্রহ কম। করের পরিমাণ কম হওয়ায় পরিষদের নিজস্ব আয়ও তেমন নেই।
ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন, পরিষদের কাজের ক্ষেত্রে এ সমস্যাগুলো দূর হলে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে নিচের এই অংশটি অনেক শক্তিশালী হবে। সাধারণ মানুষের অনেক সমস্যার সমাধান ইউনিয়নেই করা যাবে। এ সমস্যাগুলো দূর করতে হবে সরকারকে।
দুই বছর ধরে বেসরকারি সংস্থা দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের একটি প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও স্থানীয় জনগণ ইউপিকে সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু করার ক্ষেত্রে এসব সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়েছেন বলে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন।
হাঙ্গার প্রজেক্ট ওই ১০টি ইউপির জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে এ জন্য প্রশিক্ষণও দেয়। এ কাজে হাঙ্গার প্রজেক্টকে সহায়তা করছে জাতিসংঘের গণতন্ত্র তহবিল (ইউএনডিইএফ) ও ব্র্যাক। এই ১০টি ইউনিয়ন হলো টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ফলদা, অলোয়া ও নিকরাইল, গোপালপুরের হেমনগর ও ঝাওয়াইল, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার কুষ্টিয়া, দাপুনিয়া, ভাবখালি, বয়রা ও চর ঈশ্বরদিয়া। মূলত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি, নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।
চর ঈশ্বরদিয়া ইউপির চেয়ারম্যান মোর্শেদুল আলম জাহাঙ্গীর বললেন, ইউনিয়ন পরিষদের শুধু একজন সচিব রয়েছেন। ফলে নাগরিকেরা এসেই তাঁদের চাহিদামতো সেবা সব সময় পান না বা বিলম্ব হয়। তিনি বলেন, একজন কম্পিউটার অপারেটর ও একজন হিসাবরক্ষক থাকলে ভালো হতো। একজন চেয়ারম্যান ১ হাজার ৬০০ টাকা, সদস্য ৯০০ এবং চৌকিদারেরা মাত্র ১ হাজার ৬০০ টাকা সম্মানী ভাতা পান। এটা যৌক্তিক পর্যায়ে আনলে কাজে উৎসাহ বাড়বে।
হেমনগর ইউপির চেয়ারম্যান হাবিজুর রহমান বলেন, গত অর্থবছরে তাঁর ইউপিতে কর পাওয়ার লক্ষ্য ছিল আড়াই লাখ টাকা। কিন্তু তাঁরা তুলতে পেরেছেন ৩০ হাজার টাকা। নিজস্ব অর্থ না থাকায় নিজেদের পছন্দমতো প্রকল্প নেওয়া যায় না। কেন্দ্র যা ঠিক করে দেয়, তা-ই করতে হয়।
দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ইউনিয়ন পরিষদকে সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু করতে হলে অবশ্যই সেখানে নিজস্ব জনবল দিতে হবে। অন্তত একজন বা দুজন সার্বক্ষণিক জনবল নিয়োগ দেওয়া উচিত। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধাও কিছুটা বাড়ানো উচিত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের অধীনে থাকা ইউনিয়নগুলোর কাজের ধরন আশপাশের অন্য ইউনিয়নগুলো থেকে ভিন্ন। আবার কোনো কোনো ইউপি প্রকল্পের অধীনে থাকা ইউনিয়নগুলোর কাজ দেখে নিজেরাও সেভাবে কাজ করছে। প্রকল্পের অধীন ইউপিগুলো আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এখানে জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। প্রতিবছর উন্মুক্ত বাজেট করা হচ্ছে। আইন অনুযায়ী ১৩টি স্থায়ী কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সেগুলো নিয়মিত সভা করছে। ওয়ার্ড সভা হচ্ছে। সভায় চেয়ারম্যান ও সদস্যরা গ্রামবাসীর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করছেন। সভায় সরকারের স্থানীয় কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকছেন।
এ ছাড়া ইউপি থেকে কোন ধরনের সেবা পেতে কত টাকা দিতে হবে, সেই তথ্য কার্যালয়ের বাইরে টাঙানো থাকছে। ফলে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে না।
ফলদা ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য শাহিদা খাতুন বলেন, ইউনিয়নের বিভিন্ন কাজে যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের লোকেরা আছেন, তা জানা ছিল না। এখন এলাকার মানুষ তাঁদের কাছে যায়।
ফলদা ইউপির চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম তালুকদার বলেন, বাল্যবিবাহ বন্ধ, যৌতুকসহ বিভিন্ন ধরনের ঘটনার খবর এখন সাধারণ মানুষই তাঁদের দিচ্ছে। সেই অনুযায়ী তাঁরা ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
কুষ্টিয়া ইউপির চেয়ারম্যান কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রজেক্টের অধীনে তরুণদের কমিটি আছে। তারাই সমস্যা খুঁজে বের করে আমাকে দিয়ে সমাধান করতে বাধ্য করছেন।’