শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদন

সুই-সুতায় স্বাচ্ছন্দ্য

উঠানে গল্প করতে করতে চলছে হাতের কাজ। সবার হাতে সুই-সুতা l ছবি: প্রথম আলো
উঠানে গল্প করতে করতে চলছে হাতের কাজ। সবার হাতে সুই-সুতা l ছবি: প্রথম আলো

কেউ রান্না করছেন, সঙ্গে চলছে টুপিতে নকশা তোলা। কেউ শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন, থেমে নেই নকশা করা। উঠানে গল্প করতে করতে চলছে হাতের কাজ। সবার হাতে সুই-সুতা। সুইয়ের ফোঁড়ে নান্দনিক নকশায় ফুটে উঠছে একেকটা কাপড়। বিশেষ কায়দায় সেলাই ও ভাঁজ করে ওই কাপড় দিয়ে বানানো হচ্ছে টুপি।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে ইটাকুমারী ইউনিয়নের দামুরচাকলা, চানঘাট, ইটাকুমারী, পেটভাতা গ্রাম ঘুরে দেখা গেল এমন দৃশ্য। ওই সব গ্রামের প্রায় ৭০০ নারী টুপিতে নকশার কাজ করে নিজেদের ভাগ্য বদল করেছেন। তাঁদের নকশা করা টুপি যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। দেশে আসছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
রোজ ঘুম থেকে উঠেই আরজিনা বেগম ও সুলতানা খাতুনদের খাবারের চিন্তায় অস্থির থাকতে হতো। এখন তাঁদের সেই চিন্তা নেই। নেই কোনো অভাব। স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার উপায় পেয়ে গেছেন তাঁরা। তাঁদের বাড়িতে এখন টিনের ঘর আছে, আছে নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। টুপিতে নকশার কাজ করে আরজিনা তিনটি গাভি, সাতটি ছাগল ও ৩২ শতাংশ জমি কিনেছেন। সুলতানাও কিনেছেন চারটি গাভি, পাঁচটি ছাগল ও ২২ শতাংশ জমি।
পেটভাতা গ্রামের আরজিনা ও সুলতানাই কেবল নন। স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক নারী। কথা হয় ইটাকুমারী গ্রামের পারভিনা খাতুনের সঙ্গে। জানালেন, নয় বছর আগে কাউনিয়া উপজেলার শাহাবাজ গ্রামের আবদুল জলিলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। অভাবের তাড়নায় দিনমজুর স্বামীকে নিয়ে পেটভাতা গ্রামে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। সাত বছর আগে শুরু করেন টুপিতে নকশা তোলার কাজ। এখন নিজের বাড়ি ও আবাদি জমি আছে। টুপিতে নকশার কাজ করে মাসে ৪ হাজার টাকা আয় করছেন।
পেটভাতা গ্রামের বিউটি আক্তার জানান, ভিটামাটি ছাড়া কিছুই ছিল না। এখন টিনের ঘর ও নিজের ২৮ শতাংশ জমি আছে। গাছগাছালি ঘেরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গাভি পালন করছেন। টুপিতে নকশার কাজ করে মাসে ৮ হাজার টাকা আয় করছেন। সন্তানেরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। সংসারের সবাই এখন বিউটির মতামতকে গুরুত্ব দেন।
চানঘাট গ্রামের শাহেদা বেগম রান্নাঘরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুপির কাজ করছেন। তিনি বললেন, সংসারের অন্য কাজের সঙ্গেই এ কাজ করা যায়। সংসারের সব কাজ সেরেও শুধু টুপিতে নকশার কাজ করে মাসে ৪ হাজার টাকা আয় হয়।
টুপিতে নকশা তোলার কারিগর দামুরচাকলা গ্রামের আয়েশা খাতুন জানান, সাদা কাপড়কে কেটে টুপি তৈরির উপযুক্ত করা হয়। কাটিং কারিগর প্রতি টুপিতে ১০ টাকা মজুরি পান। কাটার পর এর মধ্যে নকশা করতে হয়। এরপর মেশিনে সেলাই করা হয়। প্রতিটি টুপি সেলাইয়ের জন্য শ্রমিকেরা পান ৫৫ টাকা। হাসুর কাজের জন্য দেওয়া হয় ২৫ টাকা। নারীরা সুই-সুতা দিয়ে নকশা করার জন্য টুপিপ্রতি পারিশ্রমিক পান ৪৫০-৫৫০ টাকা। নকশি করার সুই-সুতা সরবরাহ করেন ফেনীর টুপি ব্যবসায়ী।
পেটভাতা গ্রামের আরেক কারিগর মোসলেমা জানান, টুপির দুটি অংশ থাকে। নকশা তোলার পর তা ফেনীতে টুপির মহাজনের কাছে পাঠানো হয়। সাধারণত টুপির ওপর ও নিচের দুটি অংশে বিভিন্ন রঙের রেশমি সুতা দিয়ে প্রচুর কারুকাজ করা হয়। কাজ শেষ হলে গ্রামের নারীদের মজুরি পরিশোধ করে টুপিগুলো নিয়ে যান ফেনীর ব্যবসায়ীরা। নতুন কাজের জন্য দিয়ে যান কাপড় ও সুই-সুতা। নকশাভেদে এসব টুপি হয় দুই রকম। হাফ দানা ও ফুল দানা। একটি হাফ দানা টুপির নকশার মজুরি ৫৫০ টাকা, আর ফুলদানার মজুরি ৪৫০ টাকা।
ফেনীর টুপি ব্যবসায়ী গোলাম রব্বানী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইটাকুমারী ইউনিয়নের চার গ্রামের সাত শতাধিক নারীকে দিয়ে আমি টুপিতে নকশার কাজ করাই। এরপর নকশা করা টুপি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠাই। কাপড়ভেদে সেখানে প্রতিটি টুপি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।’
ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জশিদুল হক জানান, আগে এ গ্রামের নারীরা শ্বশুরবাড়িতে নানা নির্যাতনের শিকার হতেন। এখন রোজগার করায় শ্বশুরবাড়ির সবার ভালোবাসা পাচ্ছেন। টুপিতে নকশার কাজ করে এসব গ্রামের নারীরা বাড়তি আয় করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলেয়া ফেরদৌস জানান, ওই সব গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রচেষ্টার তুলনা হয় না। টুপিতে নকশার কাজ করে ভাগ্য বদল করেছেন তাঁরা।