প্রদর্শনী

সুলতানের শিল্পসম্ভার

বেঙ্গল গ্যালারিতে চলছে শিল্পী এস এম সুলতানের ৫০ বছরের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। মেয়েকে নিয়ে প্রদর্শনী ঘুরে দেখছেন মা। গত সোমবার বিকেলে
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

সুলতানের আঁকা ছবি, সুলতানের ছবি, সুলতানকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র, সুলতানকে নিয়ে উপন্যাস—সব মিলিয়ে সুলতানময় এই প্রদর্শনীতে তাঁর পূর্ণাঙ্গ পরিচয়কেই তুলে ধরার চেষ্টা করেছে বেঙ্গল শিল্পালয়। গত শুক্রবার ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে এই প্রদর্শনী শুরু হয়। দেশের চারুকলা আন্দোলনের অগ্রগণ্য শিল্পী এস এম সুলতানের গত শতকের পঞ্চাশ থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত অর্ধশত বছরের বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পসম্ভার এই প্রদর্শনীতে একত্র করা হয়েছে দর্শকদের জন্য।

এমন অনেক শিল্পকর্ম রয়েছে, যা এই প্রদর্শনীতে প্রথম প্রদর্শিত হচ্ছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নিজস্ব সংগ্রহের ৬২টি শিল্পকর্মের পাশাপাশি সুলতানের সামগ্রিক পরিচয় নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে তুলে ধরতে সুলতানের সংশ্লিষ্ট অনেক রকম অনুষঙ্গও যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের প্রামাণ্যচিত্র আদমসুরত, হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাস সুলতান, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা নয়টি সাদাকালো আলোকচিত্র। আরও আছে সুলতানকে নিয়ে বেঙ্গলের তৈরি করা দুটি সিডি, সাক্ষাৎকারের অডিও, বিভিন্ন প্রদর্শনী ক্যাটালগ, ফোল্ডার, ছাপানো ছবি, শিল্প সৃষ্টিতে সুলতান যেমন দেশীয় উপাদান ব্যবহার করতেন, সেসবসহ হরেক রকম উপকরণ। প্রদর্শনীর গবেষণা সহকারী প্রিয়াংকা চৌধুরী জানালেন, পাঁচটি পর্বে শিল্পসম্ভার এবং আনুষঙ্গিক উপাদানগুলো সাজানো হয়েছে। দর্শকদের সুবিধার্থে পর্বগুলোর সামনে সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও দেওয়া হয়েছে। আগামী ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত রোববার ছাড়া প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সবার জন্য খোলা থাকবে তিন মাসের এই প্রদর্শনী।

শেখ মোহাম্মদ সুলতান (১৯২৩-১৯৯৪) দেশ-বিদেশের শিল্পানুরাগীদের কাছে ‘সুলতান’ নামেই সমাদৃত। ইউরোপ-আমেরিকা ঘুরে এসে খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে সুলতান তাঁর জন্মস্থান নড়াইলের মাসুমদিয়া গ্রামেই থিতু হয়ে আজীবন শিল্পসাধনা করে গেছেন। গ্রামের শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছিলেন শিল্পশিক্ষার স্কুল। গ্রামের কৃষিজীবী মানুষ এবং তাঁদের জীবনসংগ্রামকে শিল্পচর্চার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি। যাঁরা জমি চাষ করে, ফসল উৎপাদন করে সবার আহারের সংস্থান করেন; সেই মানুষেরাই সুলতানের ভাবনায় উঠে এসেছিলেন সমাজের চালিকা শক্তি হিসেবে। মাটিসংলগ্ন সেই সব মানুষের ভেতরের অমিত শক্তিকে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের পেশিবহুল শরীরী অবয়বে।

এই শক্তিমত্তার প্রকাশ কেবল কৃষিজীবী মানব–মানবীতেই সীমিত নয়, বরং তা সম্প্রসারিত হয়েছে তাঁদের জীবনযাত্রার সহায় ও সহযোগী প্রাণী ও প্রকৃতিতেও। তাঁর আঁকা গবাদিপশু–পাখিও বলবান। চর দখলের জন্য দুই পক্ষের যে যুদ্ধের দৃশ্য তিনি এঁকেছেন, সেখানেও মাঠ ফসলে ভর্তি। নদী প্রবহমান। সুলতানের ছবিতে কোথাও ক্ষয়িষ্ণুতা, দুর্বলতা, ভঙ্গুরতার প্রকাশ নেই। আছে সব প্রতিকূলতা জয় করে জীবনের বিকাশ অব্যাহত রাখতে এক বিপুল প্রাণশক্তির অনন্য উন্মেষ। তেলরং রেখাচিত্র, জলরং চারকোল, কালিকলমে সৃজিত পাঁচ দশকের এত শিল্পকর্ম একসঙ্গে দেখতে পাওয়া শিল্পানুরাগীদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ।

করোনার দুঃসময় অতিক্রম করে জীবনযাত্রা এখন নতুন করে এগিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম করছেন সবাই। মনের শক্তি বৃদ্ধি এখন বড় দরকার। সুলতানের ছবিতে পরাভব না মানা মানবিক শক্তির যে মহিমা উদ্ভাসিত, তা এই কঠিন সময় অতিক্রম করতে অনুপ্রাণিত করবে দর্শকদের।