>
- সড়কে বিশৃঙ্খলা
- কীভাবে, কত দিনে, কী পরিমাণ দুর্ঘটনা কমানো হবে, এ বিষয়ে কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই সরকারের।
- গতকাল ১৪ জনসহ ৫৫২ দিনে নিহত ৫,০১০

সড়ক নিরাপত্তার জন্য সরকার একের পর এক নির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত দিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু এগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ায় সড়কে বিশৃঙ্খলা চলছেই। এ কারণে প্রতিদিনই প্রাণ ঝরছে সড়ক-মহাসড়কে। প্রথম আলোর হিসাবে, গত ৫৫২ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ১০। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ১০ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৪ জন। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে প্রাণ হারান তিনজন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২২ জন প্রাণ হারান। ফরিদপুরে বিপজ্জনক ওভারটেকিং কেড়ে নিয়েছে এক পথচারী কলেজছাত্রীর প্রাণ।
বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে মারা গেছেন ২০ জন। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর ২০ দফা নির্দেশনা দেয় সড়ক নিরাপত্তা উপদেষ্টা পরিষদ। এর মধ্যে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে ছোট যান চলতে না দেওয়া, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ করা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগ আগেরই নেওয়া। আবার মোটরযান আইনেও এসব বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশই অধিক গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং চালকের বেপরোয়া মনোভাব দায়ী।
জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময়কে নিরাপদ সড়ক দশক ঘোষণা করেছে। এ সময়ের মধ্যে সদস্য দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারও এই ঘোষণায় সই করে। কিন্তু কীভাবে, কত দিনে, কী পরিমাণ দুর্ঘটনা কমানো হবে-এ বিষয়ে কোনো কর্মপরিকল্পনা নেই সরকারের।
বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মুখের কথায় চিড়া ভেজে না। সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ক্ষতি ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এত বড় ক্ষতি কমাতে কিছু পরিকল্পনা, কিছু টাকা খরচ করা এবং আইনের প্রয়োগ জোরদার করা দরকার। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়ায় গলদ আছে। তাঁদের প্রশিক্ষণও নেই। সড়কে আইনের প্রয়োগ নেই। চালকের লাইসেন্স দেওয়ার পদ্ধতি সংস্কার ও তাঁদের প্রশিক্ষণ এবং ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাঁদের পর্যবেক্ষণে নিয়ে এলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেক কমে যাবে।
বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ে প্রাণ গেল কলেজছাত্রীর
কলেজছাত্রী মনিরা আক্তার সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় ঢাকাগামী সেবা গ্রিনলাইন পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস একটি মাইক্রোবাসকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগোতে (ওভারটেকিং) গিয়ে তাঁকে চাপা দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের মশাউজান বাসস্ট্যান্ডের কাছে গতকালের এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সোয়া ঘণ্টা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন। মনিরা নগরকান্দার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর এম এ শাকুর মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। ডাঙ্গী ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী বাবা ইয়াছিন শেখের তিন মেয়ের মধ্যে মনিরা দ্বিতীয়।
বেপরোয়া গতি কেড়ে নিল তিন প্রাণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের বৈশামুড়ায় গতকাল বেলা আড়াইটায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ঢাকা থেকে সিলেটগামী এনা পরিবহনের বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে ঘটনাস্থলেই মা-মেয়েসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ যাত্রী। দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন পানিতে নিমজ্জিত বাস থেকে মা-মেয়ে ও এক শিশুর লাশ উদ্ধার করেন। নিহত যাত্রীরা হলেন রুবিনানূ নূর বেগম, তাঁর মেয়ে সামিনানূর বেগম (২০) ও সাত মাস বয়সী শিশু ইয়াসিন। রুবিনানূরের বাড়ি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের উত্তর বাড়উরা গ্রামে। ইয়াসিন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের ফারুক মিয়ার ছেলে।
বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কড্ডার মোড়ে গত মঙ্গলবার রাতে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। নিহত শাহদাত হোসেন ট্রাকের আরোহী ছিলেন। তাঁর বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার মাহমুদপুর মহল্লায়।
পাজেরোর ধাক্কায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত
কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতির পাজেরো গাড়ির ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী ছাত্রলীগের দুই নেতা নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় পাজেরোর সামনের অংশ ও মোটরসাইকেলটি দুমড়েমুচড়ে গেছে। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ছগিরশাহ কাটা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ঘটনাস্থলে নিহত পাবেল রহমান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও দিগরপান খালী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত নাবিউল আরাফাত চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সোয়া ১০টার দিকে মারা যান। তিনি একই ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও ডুলাহাজারা কলেজ থেকে সদ্য এইচএসসি পাস করেছেন।
মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক আলমগীর হোসেন বলেন, পাজেরোর মালিক জেলা পরিষদ সদস্য ও চকরিয়া পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলাম।
এ ছাড়া নরসিংদীর শিবপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আমতলা এলাকায় গতকাল যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। তাঁরা হলেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার ক্ষিরাটি গ্রামের মেহেদী হাসান ও হাসিবুল হাসান।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত মঙ্গলবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক শিশুসহ দুজন। এরা হলো বরগুনার বেতাগীর বকুলতলী গ্রামের মো. লিটন ও বরিশাল সদরের বন্দর থানার সাহেবেরহাটের বাচ্চু হাওলাদারের ছেলে কবির হোসেন। বরগুনায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত লিটনকে মঙ্গলবার বিকেলে এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সন্ধ্যায় তিনি মারা যান। একই দিন বিকেলে বরিশাল সদরে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত কবিরকে ভর্তির পর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সে মারা যায়।
মাগুরার শ্রীপুরের সাচিলাপুর-আমতৈল সড়কে মঙ্গলবার রাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেল উল্টে মারা যান এর চালক শাহীনুর জোয়াদ্দার। তাঁর বাড়ি শ্রীপুরের নলখোলা গ্রামে।
গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরে সড়ক পার হওয়ার সময় গতকাল সকালে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় তারাবানু বেওয়া নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। তাঁর বাড়ি রসুলপুর ইউনিয়নের বসনিয়াপাড়ায়।
গাজীপুরের শ্রীপুরের জৈনাবাজার এলাকায় গতকাল সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এসি সুপার শেরপুর নামের একটি বিলাসবহুল বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে ২৫ বাসযাত্রী আহত হন।