হলুদিয়া সাজের সোনালু

সোনালু ফুল। ছবিটি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে তোলা। ছবি: লেখক
সোনালু ফুল। ছবিটি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে তোলা। ছবি: লেখক

সোনাঝরা এই ফুলের নাম সোনালু। কিশোরীর কানের দুলের মতো বৈশাখী হাওয়ায় দুলতে থাকে হলুদ-সোনালি রঙের থোকা থোকা ফুল। আবার ফুলের ফাঁকে দেখা যায় লম্বা ফল। হলুদ বরণ সৌন্দর্যে মাতোয়ারা করে রাখে চারপাশ। 

খরতাপে চলতি পথে পথিকের নজর কাড়বেই। গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে প্রাণের সজীবতা নিয়ে যেসব ফুল ফোটে তার মধ্যে সোনালু উল্লেখযোগ্য। গ্রীষ্মে এ ফুল দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি তার নামের বাহার—সোনালু, সোনাইল, সোঁদাল, বান্দরলাঠি ইত্যাদি।
গাঁও-গেরামে এ ফুল বান্দরলাঠি নামেই বেশি পরিচিত। আদি নিবাস পূর্ব এশিয়া। তবে হাজার বছর আগেও এ গাছ উপমহাদেশে ছিল। মহাকবি ব্যাসের ভগবত কিংবা কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এ এই ফুলের গুণকীর্তন করা হয়েছে।
উদ্ভিদবিষয়ক একাধিক জার্নালে বলা হয়েছে, সোনালু গাছ আকারে ছোট। ডালপালা ছড়ানো-ছিটানো। দীর্ঘ মঞ্জুরিদণ্ডে ঝুলে থাকা ফুলগুলোর পাপড়ির সংখ্যা পাঁচটি। সবুজ রঙের একমাত্র গর্ভকেশরটি কাস্তের মতো বাঁকানো। এ গাছের ফল বেশ লম্বা, লাঠির মতো গোল। তা ছাড়া এর ফল, ফুল ও পাতা বানরের প্রিয় খাবার। এ জন্য এ ফুলের আরেক নাম বান্দরলাঠি। গাঢ় সবুজ রঙের পাতাগুলো যৌগিক, মসৃণ ও ডিম্বাকৃতির। ফুল এক থেকে দেড় ইঞ্চি পর্যন্ত চওড়া হয়। এ গাছের কাঠ জ্বালানি ছাড়াও অন্যান্য কাজে লাগে। ফলের শাঁস বিভিন্ন রোগের ওষুধ হিসেবে কাজে লাগে।

ছবিটি রূপগঞ্জের দাউদপুর এলাকা থেকে তোলা। ছবি: লেখক

বীজ সহজেই অঙ্কুরিত হয়, যদিও বৃদ্ধি মন্থর। এ ছাড়াও এ গাছের বাকল রং ও ট্যানিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে গ্রামে একসময় অনেক সোনালুগাছ চোখে পড়ত। এ ছাড়া হাটবাজার ও গঞ্জের চারপাশেও দেখা যেত হলুদিয়া সাজের সোনালুর উপস্থিতি। এখন হাতে গোনা কিছু গাছ দেখা যায় পথে প্রান্তরে। দিন দিন কমে আসছে সোনালুর সংখ্যা। কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, এ গাছের কাঠ খুব একটা দামি নয় বলে কিংবা গাছটি খুব ধীরে বাড়ে বলেই কেউ আর তেমন উৎসাহ নিয়ে সোনালুগাছ রোপণ করেন না।
প্রাকৃতিকভাবে যা হয়, তার ওপর ভর করেই হলুদ-সোনালি রঙের সৌন্দর্য বিতরণ করে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে সোনালু। সোনালুগাছ সাধারণত যত্ন করে লাগানো হয় না বরং সে নিজেই বেড়ে ওঠে অযত্ন-অবহেলায়। নীরবে বেড়ে ওঠে, থাকেও নিষ্প্রাণ-নির্ঝঞ্ঝাটভাবে। যখন ফুল ফোটে তখন কারও সাধ্য নেই এই গাছকে দৃষ্টি না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার। বেড়ে ওঠার সময় তেমন দৃষ্টিতে না পড়লেও ফুল ফোটার পর তা দেখে সবার মন-প্রাণ প্রশান্তিতে ভরে যায়।