
আমগাছটির বয়স নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে নানা মত। কেউ বলেন, এর বয়স এক শর বেশি। কেউ দেড় শ। আবার অনেকেই আছেন, বয়স বাড়িয়ে দুই শর ঘরে নিয়ে যেতে কসুর করেন না। তবে যত মতভিন্নতা থাকুক, শয়ের নিচে বয়স নামাতে চান না কেউই।
কেনই বা নামবেন? বিশালকায় চেহারা নিয়ে প্রায় দুই বিঘা জমিতে ছড়িয়ে আছে যে গাছ, তাকে অন্তত শতবর্ষী না বলে উপায় থাকে না। গাছটির পরিচয় তাই শতবর্ষী গাছ।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর ইউনিয়নের হিরণ্যকান্দি গ্রামেই রয়েছে এ বহু পুরোনো আমগাছটি।
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নেমে পূর্ব দিকে ইট বিছানো সর্পিল সড়ক দিয়ে আনুমানিক ৩০০ গজ এগোলেই দেখা মিলবে এ গাছের।
৫৪ শতাংশ জমির ওপর রয়েছে অতিকায় এই প্রাচীন গাছটি। এ জায়গার মালিক এখন বাদশা শেখ। তিনি বলেন, ‘দেশি প্রজাতির এই আমগাছটি আমাদের পূর্বপুরুষের কেউ রোপণ করেছেন। কে করেছেন তা জানা নেই আমার। আমার বাবা, আমার দাদাও এ আকারেই দেখেছেন গাছটি।’
আম নিয়ে একাধিক বইয়ের লেখক কৃষিবিদ মৃত্যুঞ্জয় রায়। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের দেশের আমগাছের গড়পড়তা আয়ুষ্কাল ১০০ বছর। কখনো এর বয়স ১২৫ হতে পারে। তবে ২০০ বছর হবে তা আমার জানা নেই।’
হিরণ্যকান্দির এই গাছটি দেখেছেন খামারবাড়ির কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপ্রকল্প পরিচালক (আইএফএমসি) মৃত্যুঞ্জয় রায়। তিনি বলেন, এ গাছটি ছাড়া ঠাকুরগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জে শতবর্ষী গাছ আছে।
হিরণ্যকান্দির এ গাছে প্রচুর আম ধরে। কাঁচা আম টক কিন্তু পাকলে সুমিষ্ট। ফলনভেদে কোনো বছর ৫০০ মণ আবার কোনো বছর ৭০০ মণ আম ধরে এ গাছে।
গাছটি দেখতে প্রতিদিন কম করে হলেও দেড় শ থেকে দুই শ মানুষ আসে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে। পিকনিক করতেও আসে অনেকে। বিশেষত নববর্ষ বা দুই ঈদের সময় দর্শনার্থীদের পদভারে গিজ গিজ করে আমগাছের চত্বর।
বিশালকায় গাছটির বিশালতা দেখার মতো। গাছের নয়টি কাণ্ড বটগাছের কাণ্ডের মতো মাটি ছুঁয়ে রয়েছে। গাছের নিচে অন্য কোনো গাছ বা আগাছা নেই। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয় সবুজ রঙের একটি টিলা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।
গাছটি কত প্রাচীন? জানতে চাইলে হিরণ্যকান্দি গ্রামের গৃহবধূ কুলসুম বেগম বলেন, ‘ওরে বাবা, সে কথা আমি বলতে পারব না। এ গ্রামে আমার বিয়ে হয়েছে ৫২ বছর। এসেই এ অবস্থায় দেখছি।’
মাজরা আলহাজ এজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সোহান খান বলে, ‘প্রতিদিন দর্শনার্থীরা এ আমগাছ দেখতে আসে। আমার খুব ভালো লাগে আমাদের গ্রামে এমন একটি গাছ আছে, যেটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসে।’
কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা চান এ গাছটি সংরক্ষণ করতে উদ্যোগ নিক সরকার। গাছটি ঘিরে একটি পর্যটনকেন্দ্রে গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখেন ওই এলাকার মানুষজন। বর্তমানে এ গাছটি সংরক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সরকারি বা বেসরকারি কোনো তরফ থেকে। শুধু ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে হিরণ্যকান্দি বাসস্ট্যান্ডের পাশে ‘শতবর্ষী আমগাছ’ লিখে তির চিহ্ন দিয়ে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে।
মহেশপুর ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ গাছটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহ্য। প্রতিদিনই শত শত মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এ গাছটি দেখতে আসেন। আমরা চাই এ গাছটি সরকার সংরক্ষণ করুক এবং এ এলাকায় একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলুক।’
জেলা বন কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শতবর্ষী এই আমগাছটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যাতে বন বিভাগ উদ্যোগ নেয়, সে ব্যাপারে আমি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করব।’