
গত ১৪ জানুয়ারি ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে হাঁটা শুরু করেন সাইফুল। শেষ হয় গতকাল বিকেলে কক্সবাজারে।
‘আজ ৬৪ জেলা কমপ্লিট করতেছি। বিকেলেই কক্সবাজার পৌঁছাব।’
গতকাল মঙ্গলবার সকালে মুঠোফোনে জানালেন সাইফুল ইসলাম, যিনি বেশি পরিচিত ‘হাঁটাবাবা’ হিসেবে।
গতকাল বিকেল পাঁচটায় সাইফুল পৌঁছান কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। তাঁর ভাষায়, ৬৪ জেলা ‘কমপ্লিট’ হলো। সাইফুল ইসলামের লক্ষ্য ছিল হেঁটে হেঁটে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ঘোরা। সে লক্ষ্য পূরণ হলো ৭৫ দিনে।
গত ১৪ জানুয়ারি ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ৬৪ জেলায় হাঁটা শুরু করেন ‘হাঁটাবাবা’ সাইফুল। খেলাধুলার পরিভাষায় যাকে বলে ‘লং ডিসটেনস হাইকিং’। গতকাল সন্ধ্যায় মুঠোফোনে সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ৭৫ দিনে ৩০০১ কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছালাম কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এর মধ্যে বৃষ্টির কারণে দুই দিন এবং বিশ্রামের জন্য দুই দিন হাঁটিনি।’
৬৪ জেলায় এই হাইকিংয়ের যে পথ ছিল সাইফুলের, তাতে ৩৮টি জেলা সদর পড়েছে। ২৮টি জেলার উপজেলা ধরে জেলা পার হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে ৪০ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়েছে সাইফুলকে। তিনি জানালেন, সকাল সাতটার দিকে হাঁটা শুরু করতেন, শেষ হতো সন্ধ্যা সাতটা-আটটার দিকে। যেসব পথে সেতুহীন নদী পড়েছে, সে পথ নৌকা বা ফেরিতে পার হয়েছেন।
সাইফুল বলেন, ‘এক দিনে সর্বোচ্চ হেঁটেছি ৭১ কিলোমিটার। সেটা ছিল বান্দরবান সদর থেকে কক্সবাজারের চকরিয়া পর্যন্ত।’ তবে এক দিনে সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার হাঁটার রেকর্ড সাইফুল আগেই করেছিলেন। সেটি ছিল ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে কুমিল্লার দেবীদ্বার পর্যন্ত পথ। সাইফুল হেঁটে গিয়েছিলেন টানা ২২ ঘণ্টায়।
সাইফুলের ৬৪ জেলায় এই হাঁটার উদ্দেশ্য শুধু হাইকিং বা রেকর্ড তৈরি করা নয়। তিনটি বিষয়ে তিনি সচেতনতা তৈরির কাজ করছেন। জীবন বাঁচাতে রক্তদান, প্লাস্টিক ব্যবহারে সতর্কতা এবং বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলে মানুষকে সচেতন করেছেন চলতি পথে। সাইফুল বলেন, যেখানেই গেছি বেশ সাড়া পেয়েছি। বিভিন্ন ক্লাব, জনসমাগমের জায়গায় গিয়ে কথা বলেছি।
দেবীদ্বারের সিরাজুল ইসলাম ও করুণা বেগমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সাইফুল ইসলাম। জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। ঢাকার দনিয়া কলেজ থেকে ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞানে স্নাতক সাইফুলের হেঁটে হেঁটে ঘোরার প্রতি আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই। তাঁর কথায়, ‘হাঁটাহাঁটির অভ্যাস বেড়ে গেছে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর। একটু একটু করে হাঁটার দূরত্ব বাড়িয়েছি।’ ২০২০ সালে ৪০ দিনে হেঁটে ১ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন সাইফুল। কুমিল্লা থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত এ হাঁটা ছিল বাংলাদেশের সীমান্ত ধরে। এর আগে ২০১৮ সালের ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা বান্দরবান থেকে আলীকদম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার পথ হাইকিং করেন তিনি।
৬৪ জেলার এই পদযাত্রায় সাইফুল ইসলাম রাত কাটিয়েছেন বিভিন্ন জেলার সার্কিট হাউসে, উপজেলার ডাকবাংলো কিংবা হোটেলে। কখনো কখনো পরিচিত কারও বাসায়। সাইফুল বলেন, যেখানেই পৌঁছেছেন, সেখানকার সাইক্লিস্ট ও রানাররা (দৌড়বিদ) উৎসাহ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। সাইফুলের এই অ্যাডভেঞ্চারে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ষড়জ অ্যাডভেঞ্চার। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান এবং ১৮ বার বাংলা চ্যানেল পাড়ি দেওয়া সাঁতারু লিপটন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, সাইফুলের এই অর্জন তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে এবং সাহস জোগাবে। সাইফুলের এই অ্যাডভেঞ্চার মনিটরে সহায়তা করেছে হাইকার সোসাইটি অব বাংলাদেশ।
৩০০১ কিলোমিটার হাঁটা শেষ করে সাইফুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় দেখা করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সঙ্গে। জেলা প্রশাসক এই পদযাত্রা সম্পন্ন করার জন্য সাইফুলকে অভিনন্দিত করেন। তিনি বলেন, সামাজিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিভিন্ন বিষয়ে সারা দেশের মানুষকে সচেতন করার এই উদ্যোগ প্রশংসা করার মতো।
বাংলাদেশের সব জেলা ঘোরার পর সাইফুলের স্বপ্ন এখন আরও বড়। তিনি বললেন, ‘এবার দেশের বাইরে হাইকিং করতে চাই। এক দেশ থেকে অন্য দেশে হেঁটে যেতে চাই।’
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার।