
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড অংশ প্রায় ১৪০ কিলোমিটার খানাখন্দে ভরা। গত এক মাসের বৃষ্টিতে মহাসড়কের এই অংশে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও মহাসড়ক ফেটে গেছে, কোথাও পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও দেবে গেছে। এতে মহাসড়কজুড়ে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। জনদুর্ভোগ মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে এই শঙ্কা আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ে এ কাজ শেষ না হওয়ায় মহাসড়কের পুরোনো অংশের দিকে নজর দেয়নি কর্তৃপক্ষ। ফলে দিনের পর দিন মহাসড়ক কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হয়েছে। এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে।
গত শনিবার দুপুরে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা থেকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শেষ সীমানা মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা হয়। এর মধ্যে দাউদকান্দির হাছানপুর, শহীদনগর ও হরিপুরে মহাসড়কে বড় বড় গর্ত রয়েছে। ইলিয়টগঞ্জসংলগ্ন গোমতা অংশে ৫০ ফুট এলাকাজুড়ে গর্ত। যানবাহনকে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। চান্দিনার চান্দিনা বাজার ও মাধাইয়া বাজারে বড় ধরনের শতাধিক গর্ত দেখা গেছে। কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকা থেকে আলেখারচর পর্যন্তও বড় আকারের খানাখন্দ রয়েছে। এসব খানাখন্দে বৃষ্টির পানি জমে বিতিকিচ্ছি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
ঝাগুরজুলি ও সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় সড়ক ফেটে গেছে। চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম বাজারের পূর্ব অংশ, বাতিশা ও নানকরা এলাকায় মহাসড়কে এবড়োখেবড়ো। এসব এলাকায় মহাসড়ক দেবেও গেছে।
জানতে চাইলে কুমিল্লা থেকে ঢাকাগামী এশিয়া লাইন পরিবহনের অন্যতম স্বত্বাধিকারী জলিশ আবদুর রব বলেন, মহাসড়কে খানাখন্দ থাকার কারণে বাসের টায়ারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ছে বাস। সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় সংযোগ সড়ক মূল সড়ক থেকে এক ফুট নিচে করা হয়েছে। সেখানে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একই রুটের তিশা পরিবহনের চালক কামাল হোসেন বলেন, রাস্তায় গর্ত থাকার কারণে গাড়ি আস্তে চালাতে হয়। গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।
জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুর রহিম বলেন, ‘চার বছর আগে আমরা মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের অধীনে হস্তান্তর করেছি। এখন এই মহাসড়ক তারাই দেখভাল করছেন।’
জানা যায়, মহাসড়কের কুমিল্লা জেলার অধীন ১০০ কিলোমিটারে চার লেন কর্তৃপক্ষ তিনটি অংশে কাজ করছে। এর মধ্যে দাউদকান্দি থেকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আলেখারচর পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার প্রকল্প-১, আলেখারচর থেকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার নানকরা পর্যন্ত ৪১ কিলোমিটার প্রকল্প-২ এবং নানকরা থেকে মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার প্রকল্প-৩-এর অধীনে।
প্রকল্প-১-এর ব্যবস্থাপক দিদারুল আলম তরফদার বলেন, ‘অস্বাভাবিক বৃষ্টির কারণে দাউদকান্দির কিছু এলাকা, মাধাইয়া, চান্দিনা, ময়নামতি সেনানিবাস এলাকা ও আলেখারচরে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বিটুমিনাস দিয়ে গর্ত ভরে দিচ্ছি।’
প্রকল্প-২-এর ব্যবস্থাপক মাসুম সারওয়ার বলেন, ‘বর্ষার কারণে চার লেনের কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে পদুয়ার বাজারে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। মহাসড়কে এবার অনেক বড় গর্ত হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি মেরামতের।’
সীতাকুণ্ড অংশ: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা খানাখন্দে ভরা। কয়েক মাস ধরে এখানে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। দুঃসহ ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রীরা।
সড়কের এ অংশটি সম্প্রসারিত চার লেন প্রকল্পের দেশীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহের ব্রাদার্স কয়েকবার সংস্কার করেছে। কিন্তু কোনো সংস্কারই স্থায়ী হচ্ছে না।
গতকাল সোমবার, গত রোববার ও শনিবার মহাসড়কের এ অংশে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডের বড় দারোগাহাট, ছোট দারোগাহাট, সীতাকুণ্ড দক্ষিণ বাইপাস, ফকিরহাট, কুমিরা বাইপাস, জোড় আমতল ফকিরহাট, বিশ্ববিদ্যালয় গেট, পাক্কা মসজিদ, বারআউলিয়া, ফুলতলা, চৌধুরীঘাটা, কাসেম জুট মিল, মাদাম বিবিরহাট, ভাটিয়ারী, বিএমএ, জলিল গেটসহ অন্তত ৩০ কিলোমিটার সড়কেই খানাখন্দ। শনিবার সকালে বারআউলিয়া সেতু এলাকায় এমনই একটি গর্তে পড়ে একটি ট্রাকের চাকা ফেটে যায়।
বগুড়াগামী ট্রাকের চালক শামসু বললেন, ঢাকা থেকে সীতাকুণ্ড অংশে প্রবেশ করলেই ট্রাক সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার বেগে চালাতে হয়। খানাখন্দ অংশে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার বেশি চালানো যায় না। এতে রাস্তায় যানজট লেগে যায়।
গত শনি ও রোববার বারাআউলিয়া ও ভাটিয়ারী বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, তাহের ব্রাদার্সের লোকজন গর্তগুলোয় কোথাও কোথাও আস্ত ইট, কোথাও বিটুমিন দিয়ে সংস্কার করছে। সেখানে উপস্থিত সওজ ও ঠিকাদারের সুপারভাইজার মো. হানিফ ও শহিদুল্লাহ বলেন, ঈদ সামনে রেখে সড়কটি অস্থায়ীভাবে সংস্কার করছেন তাঁরা। তাঁরা এও স্বীকার করেন, বৃষ্টি হলে এ সংস্কার কোনো কাজে আসবে না।
সড়কের এ অংশে তাহের ব্রাদার্স ছাড়াও চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো চার লেনের কাজ করছে। তবে গত তিন দিন সরেজমিন গেলে সড়ক সংস্কারে সিনোহাইড্রোর কোনো লোকজনকে দেখা যায়নি।
চার লেনের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক অরুণ আলো চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, সড়কের এ অংশে আরও উঁচু করে বিটুমিন কংক্রিটের মিশ্রণ (প্রোপাইল কারেকশন) দিতে হবে। বিশেষ করে, সীতাকুণ্ড ও কুমিরা বাইপাস এলাকায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাহের ব্রাদার্স চুক্তি অনুযায়ী কুমিরা থেকে সিটি গেট পর্যন্ত সড়কের সংস্কার করছে। তবে চীনা কোম্পানি সিনোহাইড্রো মহাসড়কের পুরোনো অংশে সংস্কারকাজ করছে না। ওই অংশে সওজের পক্ষ থেকে স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে সংস্কারকাজ করা হচ্ছে।
তাহের ব্রাদার্সের উপপ্রকল্প ব্যবস্থাপক এফ আর ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টি বন্ধ হলেই তাঁরা সংস্কারকাজ করছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন ঈদে যাতে যান চলাচল ব্যাহত না হয়।
হাইওয়ে চট্টগ্রামের সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন শিকদার বলেন, খানাখন্দের কিছুটা উন্নতি হলে সীতাকুণ্ডে যানজট হবে না। খানাখন্দে পড়ে কোনো গাড়ি নষ্ট হলে পুলিশের পক্ষ থেকে শত চেষ্টা করেও যানজট নিরসন সম্ভব হয় না।