৫ বছরেও গড়ে ওঠেনি অবকাঠামো

>
  • অবহেলায় পারকি সৈকত 
  • পর্যটন এলাকা ঘোষণা হয়েছে ২০১৩ সালে।
  • সুযোগ-সুবিধা কিছুই নেই, তবু আছেন পর্যটক।
  • পর্যটক পুলিশ নেই।
নয়নাভিরাম পারকি সৈকত। অবকাঠামোগত কিছু সুবিধা বাড়লে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এই সৈকত বদলে যেত। ছবি: প্রথম আলো
নয়নাভিরাম পারকি সৈকত। অবকাঠামোগত কিছু সুবিধা বাড়লে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার এই সৈকত বদলে যেত।  ছবি: প্রথম আলো

একের পর এক ঢেউ ভাঙছে পারকি সৈকতে। সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে সৈকতে প্রচুর মানুষ। কেউ পরিবারসহ এসেছেন। কেউ এসেছেন বন্ধুরা মিলে। আড্ডা দিচ্ছেন, ঘুরছেন, ছবি তুলছেন।
এর মধ্যেই মোটরসাইকেলের ছোটাছুটি। হর্নের তীব্র শব্দ। সৈকতের বালিয়াড়ি ও ঝাউবনের ভেতর যত্রতত্র ডাবের খোসা, চিপসের প্যাকেট, খড়কুটো। ভাসমান কোমল পানীয় ও ফুচকার দোকান।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। সূর্য বিদায় নিল গভীর সাগরে। তবু ভিড় কমে না। চট্টগ্রামের আনোয়ার উপজেলার ২ নম্বর বারশত ইউনিয়নের পারকি সৈকত। গ্রামের নাম দুধকুমড়া।

বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে পারকি সৈকতকে পর্যটন এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। স্বীকৃতির পাঁচ বছর পার হলেও এখানে সেই অর্থে কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

কর্ণফুলীর মোহনা থেকে দক্ষিণে শঙ্খ নদের মোহনা পর্যন্ত মোট ১০ কিলোমিটার সৈকত। সেখানে পারকি এলাকার দুই কিলোমিটারে পর্যটকেরা যান। এখানকার একটি অংশে সৃজন করা ঝাউগাছ আছে। সৈকতের প্রস্থ কোনো কোনো অংশে এক কিলোমিটারের কম বা বেশি।

চট্টগ্রাম শহর থেকে অল্প সময়ে এবং অল্প খরচে চলে আসা যায় পারকি সৈকতে। বহির্নোঙরে জাহাজ আর চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার দৃশ্য এ সৈকতের বাড়তি আকর্ষণ। এখানকার বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অবকাঠামোগত কিছু সুবিধা বাড়লে সৈকতের অবস্থা বদলে যেত। তবে পারকি এমন একটা সৈকত, এখানে এসে ডানে-বামে যাওয়ার সুযোগ কম। ডানে ঝাউবনের দিকে গেলে নিরাপত্তাহীনতা। সম্প্রতি এখানে ছিনতাইয়ের নেতৃত্ব দেওয়া যুবকটি গ্রেপ্তার হয়েছেন অস্ত্রসহ।

নগরের পতেঙ্গা থেকে এসেছেন তিন কলেজছাত্রী। মাঝেমধ্যে আসেন। জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনারা কক্সবাজার সৈকতে গিয়েছেন? জবাব এল, ‘আমাদের এত সুন্দর সৈকত থাকতে কক্সবাজার কেন যাব?’

চট্টগ্রাম সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সূত্র জানায়, পারকি সৈকত এলাকার বিভিন্ন মৌজা থেকে সরকার ৬৭৫ একর জায়গা পর্যটনের গেজেটভুক্ত করে। সেখান থেকে ১৩ দশমিক ২৬ একর জায়গায় রিসোর্ট করার পরিকল্পনা আছে পর্যটন করপোরেশনের। গত ৩ অক্টোবর (২০১৭) ওই জায়গাকে করপোরেশনের সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রশাসন। ২০১৫ সালের ১১ জুন একনেকের বৈঠকে পারকি ও পতেঙ্গা সৈকতের উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। কিন্তু এখনও প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়নি।

সৈকতে পর্যটকদের ছবি তোলেন এমন এক তরুণ প্রথম আলোকে বলেন, এখানে কিছু মোটরসাইকেলচালক আছেন, তাঁরা সৈকতের দুই পাশে এক চক্কর দিলেই ১২০ টাকা ভাড়া নেন। অনেক সময় জোর করে পর্যটকদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। তা ছাড়া স্থানীয় কিছু যুবক আছেন, যাঁরা বিকেল হলেই মোটরসাইকেল নিয়ে ঢুকে পড়েন সৈকতে। তাঁদের বেপরোয়া চালনায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।

সৈকতে জেলা প্রশাসন দুটি শৌচাগার তৈরি করে দিলেও একটি ব্যবহার অনুপযোগী। সৈকতের অবৈধভাবে চলা দোকানগুলোতে বিদ্যুৎ থাকলেও বালুচরে বিদ্যুৎ নেই। নেই কোনো পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, কিংবা যাত্রীছাউনি। পারকি সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য কোনো পর্যটক পুলিশ নেই।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় পর্যটক পুলিশের জন্য কোনো স্টেশন নির্মাণের কাজ এগোয়নি। এ ছাড়া ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য এখানে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

পারকি সৈকত যে ইউনিয়নের মধ্যে সেই ২ নম্বর বারশত ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এম এ কাইয়ুম শাহ জানালেন, পারকি সৈকতে প্রবেশ ও বেরোনোর দুটি সড়ক নির্মাণের জন্য উপজেলা এলজিইডি অফিসে চিঠি এসেছে। এই সড়ক দুটি তাঁরা নির্মাণ করে দেবেন। এ ছাড়া পার্কিং এলাকা নির্মাণের জন্যও বরাদ্দ এসেছে। তাঁর মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে, সৈকতের অন্তত এক কিলোমিটার পর্যন্ত একটি ওয়াকওয়ে বা পায়ে চলার পথ তৈরি এবং এর দুই পাশ ঘিরে আলোর ব্যবস্থা করা। আর একটি পার্কিং এলাকা গড়ে তোলা। মাসখানেক আগে বৈঠকে এ বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়েছে।

সৈকতের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কর্ণফুলী থানার ওসি সৈয়দুল মোস্তফা প্রথম আলোকে বলেন, পারকি সৈকতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে সবসময় পুলিশের একটি দল দায়িত্ব পালন করে। কিছুদিন আগেও অবৈধ ঝুপড়ি ও কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মহিবুল হক বলেন, সরকার সেখানে সব রকমের উন্নয়নকাজ শুরু করেছে।