‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা-২০২৫’ অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের হাত থেকে সম্মাননা নিচ্ছেন নিউ এজ সম্পাদক ও ‘দ্বিরালাপ’ বইয়ের লেখক নূরুল কবীর। সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে
‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা-২০২৫’ অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের হাত থেকে সম্মাননা নিচ্ছেন নিউ এজ সম্পাদক ও ‘দ্বিরালাপ’ বইয়ের লেখক নূরুল কবীর। সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে

মনন চর্চার বই নিয়ে ব্যতিক্রমী মেলা

পড়ন্ত বেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আর গ্রন্থানুরাগীদের সমাগমে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল বইমেলার পরিবেশ। অবশ্য এই বইমেলা গতানুগতিক ধাঁচের বইয়ের নয়। নেই গল্প–উপন্যাস–কবিতার সম্ভার। এই মেলা যুক্তি, তর্ক, বিচার, বিশ্লেষণের বই নিয়ে। নাম ‘নন-ফিকশন বইমেলা।’ নবমবারের মতো ব্যতিক্রমী এই বইমেলা যৌথভাবে আয়োজন করেছিল অর্থ-বাণিজ্যবিষয়ক দৈনিক বণিক বার্তা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রাঙ্গণে তিন দিনের এই মেলা শেষ হলো সোমবার।

বিকেলে মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালে প্রকাশতি দুটি বইকে ‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা ২০২৫’ দেওয়া হয়। বই দুটি হলো কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত দ্য নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের ‘দ্বিরালাপ: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও পূর্বাপর রাজনীতি সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক আলাপচারিতা’। আর প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের ‘শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা’। পুরস্কার হিসেবে ৫০ হাজার টাকার অর্থমানের চেক ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। এবার লেখকদের পাশাপাশি প্রকাশকদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়।

দ্বিরালাপ, নূরুল কবীর, কথাপ্রকাশ

নন-ফিকশন বইমেলা শুরু হয়েছিল গত শনিবার। মেলায় এবার ৩৯টি প্রকাশনা ও গবেষণা সংস্থা অংশ নেয়। বই বিক্রি হয় শতকরা ২৫ ভাগ কমিশনে। শিক্ষার্থী ও পাঠকদের মধ্যে ব্যবসা, অর্থনীতিসহ বিশ্লেষণধর্মী বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরা এবং এ ধরনের বই পাঠে আগ্রহী করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে নন-ফিকশন বইমেলা আয়োজন করা হচ্ছে।

বিকেলে নবম নন-ফিকশন বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার। তিনি বলেন, ‘নন-ফিকশন বই শুধু তথ্যই দেয় না; চিন্তা তৈরি করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি শেখায় এবং সমাজকে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণে নন-ফিকশন বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) মামুন আহমেদ বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চাই। সে জন্য এ ধরনের চিন্তা ও মননশীল বইমেলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই মেলা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে আরও নিবিড় যোগাযোগ ও ভাবনার বিনিময়ে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।’ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই মেলা করার জন্য সহায়তা দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা-২০২৫’ অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের হাত থেকে প্রথমা প্রকাশনের পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করছেন প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। সোমবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণে

সমাপনী অনুষ্ঠানে পুরস্কারের জন্য বইগুলোর বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ও সদস্যরাও বক্তব্য দেন। সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, একটি জাতির চিন্তাধারা বিকশিত হলে সেই জাতি অবশ্যই উন্নতি করবে। এ জন্য শিক্ষিত সমাজের ভূমিকা রয়েছে। চিন্তাভাবনায় উৎসাহ সৃষ্টির জন্য এ ধরনের মেলার আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ। মেলায় নন-ফিকশন বইয়ের পাঠকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটা আশার কথা।

বিচারকমণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, মেলার আয়োজকদের আগ্রহ ছিল তরুণ লেখক, বিশেষ করে অনূর্ধ্ব ৪০ বছর বয়সী লেখকদের বই পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা। কিন্তু তরুণদের লেখা মানসম্মত নন-ফিকশন বই পাওয়া যায়নি।

বিচারকমণ্ডলীর আরেক সদস্য ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, অনেকগুলো মানসম্মত বই এবার এসেছিল। প্রাথমিকভাবে ৩০টি বই ও সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে ১০টি বাছাই করে সেরা দুটি বই নির্বাচন করা হয়েছে। তবে আরও বেশ কয়েকটি বই পুরস্কারযোগ্য ছিল।

শিলালিপি, মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক, প্রথমা প্রকাশন

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও বিচারকমণ্ডলীর সদস্য কথাশিল্পী আফসানা বেগম বলেন, এখন অনেক ভালো মানের নন-ফিকশন বই প্রকাশ হচ্ছে। বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা, ভাষার মান, তত্ত্বগত দিক, ইতিহাস এসব বিভিন্ন দিক বিচার করে দুই সেরা বই নির্বাচন করা হয়েছে।

পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় দ্বিরালাপ গ্রন্থের লেখক সাংবাদিক নূরুল কবীর বলেন, লেখক হিসেবে পুরস্কার গ্রহণের জন্য এবারই প্রথম কোনো অনুষ্ঠানমঞ্চে দাঁড়ালেন তিনি। বইটিতে তিনি তাঁর ভাবনাগুলো ধাপে ধাপে যুক্তি বিশ্লেষণ দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। তিনি সাধারণত পাঠককে আনন্দিত করার জন্য, চিন্তাভাবনায় প্রভাবিত করার জন্য লিখে থাকেন। বইটি পুরস্কার পাওয়ায় তিনি আনন্দিত।

শিলালিপি গ্রন্থের লেখক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক বিদেশে অবস্থান করছেন। তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই শিলালিপিগুলো আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বুঝতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। আমরা এসব শিলালিপির মাধ্যমে বুঝতে পারি যে আমাদের বাঙালি ও বাঙালিয়ানার এক বর্ণময় ইতিহাস বহুত্ববাদ ও বৈচিত্র্য এবং সহিষ্ণুতার এক ঐতিহ্যবাহী বুনিয়াদের উপর গড়ে উঠেছিল।’

প্রথমা প্রকাশনের পক্ষে প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ পুরস্কার গ্রহণ করে বলেন, ‘শিলালিপি বইটিতে লেখক লিপিগুলোর অনুবাদের পাশাপাশি বাংলা অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্ম ও জনজাতির মানুষ যে একসময় মিলেমিশে থাকতেন, সেই বিষয়টিও যুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আমাদের চিন্তাকে নবায়ন করতে বইটি সহায়ক হবে।’

অনুষ্ঠানে আরও আলোচনা করেন কথাপ্রকাশের প্রকাশক জসিম উদ্দিন, ইউপিএলের পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন ও লেখক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। স্বাগত বক্তব্য দেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, সমাপনী বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম।