নির্বাচনকে সামনে রেখে গণমাধ্যমের ডিজিটাল ফটোকার্ড নকল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে
নির্বাচনকে সামনে রেখে গণমাধ্যমের ডিজিটাল ফটোকার্ড নকল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে

সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড বানিয়ে ছড়ানো হচ্ছে একের পর এক অপতথ্য

ভোটের হাওয়ায় এবার গুজব ব্যাপকভাবে উড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তা ঘটছেও। ফেসবুকে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে ফটোকার্ড হয়ে উঠেছে বড় হাতিয়ার। আর ভুয়া তথ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য করতে কার্ডগুলো তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কার্ডের আদলে। তাতে কাউকে কাউকে সেগুলো বিশ্বাস করতেও দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য নিয়ে এমন একটি ভুয়া কার্ড ছড়ায়। ফেসবুকে ছড়ানো ওই ফটোকার্ডটি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ফেসবুক ফটোকার্ডের নকশায় তৈরি করা হয়।

কার্ডটিতে মির্জা ফখরুলের একটি ছবি ব্যবহার করে লেখা হয়, ‘নির্বাচনের পরে বিএনপি চাঁদাবাজি কমিয়ে দিবে: মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর’ (বানান অপরিবর্তিত)।

ফটোকার্ডের ওপরের বাঁ পাশে চ্যানেলটির লোগোর আদলে তৈরি একটি ভিন্ন লোগো বসানো ছিল। নিচে বাঁ পাশে ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ লেখা এবং মাঝখানে চ্যানেলটির ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেওয়া। ডান পাশে লেখা ‘বিস্তারিত কমেন্টে’।

ফটোকার্ডটি ছড়িয়ে পড়ার পর মন্তব্যের ঘরে বিভ্রান্তিকর প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। একজন লেখেন, ‘আপনারা তাহলে স্বীকার করছেন যে আপনারা চাঁদাবাজি করেন।’ আরেকজন মন্তব্য করেন, ‘এ কথায় প্রমাণিত হয় বিএনপি চাঁদাবাজি করে।’

ফটোকার্ডটি ফেসবুকের একটি গ্রুপ থেকে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ যাচাই করে দেখা গেছে, ওই সংবাদমাধ্যম এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশই করেনি।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। এই নির্বাচনের প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে ২২ জানুয়ারি থেকে। তবে তার আগে থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চলছে। পাল্টাপাল্টি প্রচারে বিভ্রান্তির তথ্যও ছড়ানো হচ্ছে।  

ডিজিটাল অধিকার ও তথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইট সম্প্রতি তাদের প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলেছিল, এবার নির্বাচনে ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারের কর্তব্যক্তিরাও এবার নির্বাচনে ডিজিটাল পরিসরে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো নিয়ে শঙ্কার কথা বলে আসছেন।

গুজব বা অপতথ্যের ক্ষেত্রে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও ব্যবহার দেখা গেলেও ফেসবুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভুয়া বক্তব্য দিয়ে ফটোকার্ডই বেশি দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন পেজ থেকে এগুলো তোলার পর হাজার হাজার বার শেয়ার হতে দেখা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য ভেবে এগুলো বিশ্বাস করেছেন অনেকে।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নামে একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে। ‘আপনি যদি জামায়াত না করেন, আপনি স্পষ্ট অমুসলিম’ তাঁর এমন কথাজুড়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের নকশায় ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়। অথচ ওই টেলিভিশন চ্যানেলের ফেসবুক পেজে এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়নি। যাচাই করে দেখা যায়, আলোচিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত লোগোটি সংশ্লিষ্ট টিভি চ্যানেলের আসল লোগোর সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।

আরও দুটি ফটোকার্ডে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদা মিতু ও দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দেওয়া হয়। একটি ফটোকার্ডে লেখা ছিল, ‘মধ্যরাতে মাহমুদা মিতুকে নিয়ে হোটেল ওয়েস্টিনে নাহিদ ইসলাম’। অন্যটিতে লেখা ছিল, ‘প্রার্থিতা পাননি মাহমুদা মিতু, গভীর রাতে সান্ত্বনা দিলেন নাহিদ ইসলাম’।

দুটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নকশায় এই ফটোকার্ড দুটি তৈরি করা হয়। অথচ ওই সংবাদমাধ্যম দুটি এমন কোনো ফটোকার্ড কিংবা খবর প্রকাশই করেনি।

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত বছর গণমাধ্যমের নাম, লোগো ও শিরোনাম নকল করে ৬৮৭টি ঘটনায় দেশি-বিদেশি ৭৫টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে মোট ৭৪৪টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন দুটির বেশি ভুয়া তথ্য ছড়াতে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাবের গত বছরজুড়ে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্য নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছড়ানো গুজবের ২১ শতাংশই গ্রাফিক কার্ড বা ফটোকার্ডের মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মী, সরকারের উপদেষ্টা কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া উক্তি তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুয়া ফটোকার্ডের ৭৪ শতাংশই ছড়িয়েছে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে।

ভুয়া কার্ড চেনার উপায়

এ ধরনের কার্ড তৈরির মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ভুয়া তথ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। তবে পাঠক একটু সচেতন হলেই এগুলোর অসংগতি ধরতে পারবেন।

অনেক ক্ষেত্রে পোস্টের কমেন্ট সেকশনে সংবাদটির কোনো লিংক থাকে না। লোগোর বানানে সামান্য ভুল, ঝাপসা রেজোল্যুশন কিংবা পরিচিত লোগোর সঙ্গে সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়ে। ফন্ট, লেখার বিন্যাস ও শিরোনামের ভাষাও মূলধারার সংবাদশৈলীর সঙ্গে মেলে না।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর যাচাইয়ের উপায় হলো সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে মিলিয়ে দেখা।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ভুয়া দাবি নিয়ে ওই গণমাধ্যমে কোনো সংবাদই প্রকাশ হয়নি। পাশাপাশি যে অ্যাকাউন্ট বা পেজ থেকে ফটোকার্ডটি ছড়ানো হচ্ছে, তার আগের কার্যক্রম দেখলেও অপতথ্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।