আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান
আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান

বিদেশি আইনজীবী নিয়োগে আনিসুল-সালমানের আবেদন ১০ মাসেও নিষ্পত্তি হয়নি, নিয়ম ও অতীত অভিজ্ঞতা কী

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার আসামি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান গত বছরের ডিসেম্বরে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করার জন্য আবেদন করেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রায় ১০ মাসেও তাঁদের এ আবেদন নিষ্পত্তি করেনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ চলা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার আসামি আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান। দুজনেই বর্তমানে কারাগারে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, এই মামলায় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান নিজেদের পক্ষে গত বছরের ডিসেম্বরে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। জেল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁরা বার কাউন্সিলে এ আবেদন করেন। তাঁরা যখন এ আবেদন করেছিলেন, তখন মামলাটি প্রি–ট্রায়াল (মূল বিচারের আগে প্রস্তুতিমূলক ধাপ) পর্যায়ে ছিল। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পরে ২২ ফেব্রুয়ারি এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এ মামলায় ১২ জন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ চেয়ে করা এই আবেদন নিষ্পত্তি না হলে আসামি দুজন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

সুপ্রিম কোর্ট খোলার পর তাঁরা যখন আসবেন, তখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সেই সভা যখন হবে, তখন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের যত আবেদন আছে, সব দেখা হবে।
মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও অ্যাটর্নি জেনারেল

বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। এ বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, এখন সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ। বার কাউন্সিলের সব সদস্য এখন ঢাকায় নেই, দেশে–বিদেশে অবস্থান করছেন। সুপ্রিম কোর্ট খোলার পর তাঁরা যখন আসবেন, তখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সেই সভা যখন হবে, তখন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের যত আবেদন আছে, সব দেখা হবে।

১৬ সেপ্টেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি চলছে। ছুটি শেষে নিয়মিত কার্যক্রম চলবে আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে।

আইন কী বলে

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিরা বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বলা আছে। আইনটির ১১ নম্বর ধারার ৮ উপধারায় বলা আছে, বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, বার কাউন্সিলের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে ট্রাইব্যুনাল কোনো বিদেশি আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার অনুমতি দিতে পারবে। বার কাউন্সিল যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়া এই অনুমতি প্রদান আটকে রাখবে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আইনটি ২০২৪ সালে পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে বলা হয়েছিল বার কাউন্সিলের অনুমতি সাপেক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করা যাবে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল দেখতে পারবেন, কেন দেওয়া হচ্ছে না কিংবা অপ্রয়োজনীয়ভাবে কিছু করা হয়েছে কি না। উচ্চ আদালত কী করবেন, সেটা পরের ব্যাপার।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

বার কাউন্সিলকে নির্দেশনা দিতে আবেদন

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ ২১ সেপ্টেম্বর মামলার তালিকায় সালমান এফ রহমানের বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে একটি আবেদন ওঠে। তবে সেদিন শুনানি হয়নি। ২৮ সেপ্টেম্বর আবেদনটির শুনানির দিন ধার্য আছে। ট্রাইব্যুনালে করা সে আবেদনে বলা হয়েছে, সালমান এফ রহমান এর আগে একটি আবেদনে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়ার প্রার্থনা করেন। সে আবেদন ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মঞ্জুর করেন। পরে এই অভিযুক্তের আবেদন জেল কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রক্রিয়ায় বার কাউন্সিলে পাঠায়।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, সালমান এফ রহমানের হয়ে লড়াই করার জন্য গত ১৭ আগস্ট বার কাউন্সিলের কাছে ই–মেইল করেন যুক্তরাজ্যের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বারের অ্যাডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড ও গ্রায়েম এম হল। সে আবেদনের হার্ড কপি (কাগজ) ২৪ আগস্ট বার কাউন্সিলকে দেওয়া হয়। তবে বার কাউন্সিল এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

আসামি সালমানের আইনজীবী পলাশ চন্দ্র রায় বলেন, ট্রাইব্যুনাল যেন বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য বার কাউন্সিলকে নির্দেশনা দেন, সে জন্য এই আবেদনটি করা হয়েছে।

ডিসেম্বরে ট্রাইব্যুনালে যা ঘটেছিল

আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ গত বছরের ১০ ডিসেম্বর একটি শুনানি হয়েছিল। শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, তাঁর মক্কেল আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করতে চান। এ জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন।

তখন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, কখন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটার জন্য ট্রাইব্যুনাল বসে থাকবেন না।

বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য এই মামলার কার্যক্রম বসে থাকেনি। তখন মামলাটি প্রি–ট্রায়াল (মূল বিচারের আগে প্রস্তুতিমূলক ধাপ) পর্যায়ে ছিল। আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর পর এখন পর্যন্ত এ মামলায় ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।

সেই শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, ট্রাইব্যুনাল আনিসুল ও সালমানের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের অনুমতি দিলে তাঁরা বার কাউন্সিলের কাছে যাবেন।

জবাবে তাজুল ইসলাম বলেছিলেন, আসামির পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য আগে বার কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। তারপর ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিতে হবে। তাঁরা আগে যখন আসামির (একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামি) জন্য বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করতে চাইতেন, তখন বার কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে আসতে বলা হতো। বার কাউন্সিল অনুমতি দিত না। সে কারণে তাঁরা আসামির জন্য বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারেননি।

তখন আসামিপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আপনি বার কাউন্সিলে যান না, অসুবিধা কী।’

দেড় দশকে কেউ পাননি

আন্তর্জাতিক অপরাধ (আইন), ১৯৭৩–এর আওতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রথমে তিন সদস্যের একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। এই ট্রাইব্যুনালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার গুরুত্ব পায়। তখন এ বিচার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ৪৪টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ১১টি মামলার রায় এসেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ছয় আসামির মধ্যে পাঁচজনই জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।

২০১৫ সালের শেষ দিকে ট্রাইব্যুনাল–২ অকার্যকর হয়ে যায়। তবে ট্রাইব্যুনাল–১–এর কার্যক্রম চলমান ছিল। গত ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল–১ পুনর্গঠন করা হয়। পরে গঠন করা হয় ট্রাইব্যুনাল–২। এই ট্রাইব্যুনাল দুটি এখন পর্যন্ত সাতটি রায়ে ৬৮ জন আসামিকে সাজা দিয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জন পলাতক। কারাগারে আছেন ৪ জন। গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি।

আইনে থাকলেও দেড় দশকেরও বেশি সময়ে ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো আসামি বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারেননি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিরা যেমন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা করছেন। তেমনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিরাও বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামিদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করা মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গোলাম আযম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদন করা হয়েছিল। সালাউদ্দিন কাদেরের পক্ষেও বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদন করা হয়েছিল। তবে তখনকার বার কাউন্সিল বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের কোনো আবেদনেই হয় অনুমতি কিংবা সাড়া দেয়নি।

আসামিদের এখন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না, এ কথা বলা যাবে না বলে মনে করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, বার কাউন্সিল এখনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।