ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাশিল্পী ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে দুই পর্বের ধারাবাহিক বক্তৃতা আয়োজন করে বেঙ্গল শিল্পালয়। আজ শনিবার সমাপনী পর্বের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাশিল্পী ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে দুই পর্বের ধারাবাহিক বক্তৃতা আয়োজন করে বেঙ্গল শিল্পালয়। আজ শনিবার সমাপনী পর্বের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মারক বক্তৃতা

বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ: দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ-পরবর্তী শিল্প আন্দোলনের রূপান্তর

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীর ভূরাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে শুরু করে মনস্তত্ত্ব, সৃজনশীলতা ও শিল্পকলার ধারণাগুলোতে আসে বিপুল পরিবর্তন। সামগ্রিক অর্থেই পৃথিবী আর আগের মতো ছিল না। সেই পরিবর্তনগুলো কোথায় কীভাবে এসেছিল? বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনেই–বা তার প্রভাব কতখানি, এসব নিয়েই এক মনোজ্ঞ আলোচনা হলো আজ শনিবার সকালে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে।

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাশিল্পী ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তাঁর স্মরণেই দুই পর্বের ধারাবাহিক বক্তৃতা আয়োজন করে বেঙ্গল শিল্পালয়।

আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পসমালোচক অধ্যাপক আবুল মনসুর। আজ ছিল বক্তৃতার দ্বিতীয় তথা সমাপনী পর্ব। ‘দুই মহাযুদ্ধের অভিঘাত ও আধুনিকতার বিবর্তন: দৃশ্যকলার পরিসরে যুগান্তরের হাওয়া’ শীর্ষক এই বক্তৃতায় তিনি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত কালপর্ব নিয়ে আলোচনা করেন। প্রথম পর্বের বক্তৃতা হয়েছিল ২৪ জানুয়ারি। সেখানে তিনি প্রথম মহাযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকাল পর্যন্ত আলোচনা করেছিলেন।

অনুষ্ঠানের সূচনায় বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সংকটময়, অতি ব্যস্ত জীবনযাত্রায় শিল্পসাহিত্যের কী ভূমিকা, কীভাবে তা আমাদের জীবনযাপনে প্রভাব রাখতে পারে, অতীতের আলোকে তা অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখে নিতেই এই বক্তৃতার আয়োজন করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাশিল্পী ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে দুই পর্বের ধারাবাহিক বক্তৃতা আয়োজন করে বেঙ্গল শিল্পালয়। আজ শনিবার সমাপনী পর্বের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা

আলোচক অধ্যাপক আবুল মনসুর শুরুতেই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্যে তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন। এরপর মূল আলোচনায় তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধের ক্ষত, ব্যক্তিমানুষের সংকট এবং যান্ত্রিক নগরজীবনের প্রভাব শিল্পকে কীভাবে প্রথাগত অলংকরণ থেকে বের করে এক বৈশ্বিক ও দার্শনিক রূপ দান করেছে। সেখানে ব্যক্তিশিল্পীর আত্মপ্রকাশই প্রধান হয়ে উঠেছে।

আবুল মনসুর তাঁর আলোচনা শুরু করেছিলেন শিল্পকলার প্রথাগত গণ্ডি ভাঙার আন্দোলন হিসেবে ‘দাদাবাদী’ শিল্পীদের ভূমিকা উল্লেখ করে। তিনি বলেন, দাদাবাদীরা আর্ট গ্যালারি বা ধনীদের ড্রয়িংরুমে বন্দী ‘মহান শিল্পের’ ধারণাটিকে প্রত্যাখ্যান করে শিল্পকে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করতে চেয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে মার্শাল ডুশাম্পের ‘ফাউন্টেন’ (একটি ইউরিনাল বা প্রস্রাবাধারকে উল্টো করে স্থাপন করা) শিল্পকর্মটি ছিল এক বৈপ্লবিক উদাহরণ। তাঁরা বলেছিলেন ‘রেডিমেড’ বস্তুও শিল্পের মর্যাদা পেতে পারে। সালভাদর দালির অভিমত ছিল, মানুষের তৈরি যেকোনো সৃষ্টিই শিল্পের পর্যায়ভুক্ত হতে পারে।

আলোচক আবুল মনসুর বলেন, ১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্ব এবং আগের বিশ্বের মধ্যে কোনো মিল নেই। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ মানবজাতির ইতিহাসে এক ভয়াবহ ক্ষত তৈরি করে। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা মানুষের আত্মিক ও বাহ্যিক জীবনে চরম সংকট তৈরি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে দৃশ্য শিল্পকলার মূল কেন্দ্র ছিল ফ্রান্স তথা প্যারিস। যুদ্ধে ইউরোপ একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এই সময়েই দৃশ্যশিল্পের কেন্দ্র প্যারিস থেকে সরে গিয়ে আমেরিকার নিউইয়র্কে স্থানান্তরিত হয়। একই সময় যুক্তরাষ্ট্র শিল্প ও রাজনীতির প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।

এই সময়ের শিল্পসাহিত্যের আরেকটি বড় পরিবর্তনকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন আবুল মনসুর তাঁর আলোচনায়। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে সাধারণত দৃশ্যশিল্প থেকেই শিল্পের নতুন নতুন ধারণাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে এবং পরে তা কবিতা ও সাহিত্যে ফুটে উঠেছে। কিন্তু যুদ্ধের পরে এই ধারাতেও বিপুল পরিবর্তন আসে। তখন নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে সাহিত্যে, পরে তা দৃশ্যশিল্পে বিস্তার লাভ করেছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা এবং নিরাপত্তাহীনতা শিল্প ও সাহিত্যে প্রবলভাবে ফুটে ওঠে। প্রধান তিন লেখক স্যামুয়েল বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো, আলবেয়ার কামুর দ্য আউটসাইডার’ এবং জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’-এর উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে ব্যক্তিমানুষ সমাজ ও নিজের অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ আধুনিক দৃশ্যশিল্পের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

আলোচনার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী প্রধান প্রধান শিল্পধারার পরিচিতি ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তিনি এই ধারার প্রধান শিল্পীদের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো পাওয়ার পয়েন্টে বড় পর্দায় দেখিয়েছেন। ফলে শ্রোতাদের পক্ষে তাঁর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ অনুধাবন সহজ হয়েছিল। তিনি বলেন, ১৯৪৫ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত কালপরিধিতে গড়ে ওঠা শিল্প আন্দোলনগুলোর একটি প্রধান আন্দোলন ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক ‘অবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম’ বা বিমূর্ত প্রকাশবাদ। এই ধারার প্রধান শিল্পী জ্যাকসন পোলক ক্যানভাস মাটিতে বিছিয়ে রং ছিটিয়ে তাঁর ‘অ্যাকশন পেইন্টিং’ শুরু করেন। এভাবে শিল্পকর্ম করায় ছবির প্রথাগত ‘কেন্দ্রবিন্দু’ বা সীমারেখা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সীমারেখা ক্রমপ্রসারিত বা ক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ে। সারা বিশ্বেই এই ধরা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, কথাশিল্পী ও শিল্পসমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে দুই পর্বের ধারাবাহিক বক্তৃতা আয়োজন করে বেঙ্গল শিল্পালয়। আজ শনিবার সমাপনী পর্বের আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা

এ ছাড়া অন্য প্রধান ধারার মধ্যে গড়ে উঠেছিল ‘পপ আর্ট’, ‘মিনিমাল আর্ট’, ‘কনসেপচুয়াল আর্ট’। এরপরে আরও যুক্ত হয়েছে ‘ইনস্টলেশন’ ও ‘পারফর্ম আর্ট’। আলোচক এই ধারাগুলোর বৈশিষ্ট্য, প্রভাব, প্রধান শিল্পীদের কাজ নিয়ে বিষদে আলোচনা করেছেন।

পরবর্তী ধাপে অধ্যাপক আবুল মনসুর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে উপমহাদেশ ও বাংলাদেশের শিল্পকলায় এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন। এই পর্যায়ে তিনি প্রধানত বিশ্বভারতী কেন্দ্রিক ভারতের তিন শিল্পী—নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ ও বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাজ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন। এই তিন শিল্পীর পাশাপাশি ক্যালকাটা গ্রুপ ও বোম্বে প্রগ্রেসিভ গ্রুপের ভূমিকা এবং মকবুল ফিদা হুসেন ও মীরা মুখোপাধ্যায়ের ভাস্কর্যের প্রতিও আলোকপাত করেন।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে আসে বাংলাদেশের শিল্পচর্চার প্রসঙ্গ। আবুল মনসুর বলেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ছিল রেখার প্রবল শক্তি। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসাত্মক দিকটি তিনি তাঁর অপরিসীম শক্তিমান রেখায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘মনপুরা ৭০’ স্ক্রলে।

কামরুল হাসান লোকশিল্পের সঙ্গে কিউবিজম বা পাশ্চাত্যের শৈলীর সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। সফিউদ্দিন আহমদ বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা করে এসে পাশ্চাত্য শিল্পকলার বৈশিষ্ট্য তার কাজে নিজের মতো করে প্রয়োগ করেছিলেন।

আলোচক চিত্রকলার পাশাপাশি স্থাপত্যের ক্ষেত্রে মাজহারুল ইসলামের ডিজাইন করা চারুকলা ভবন এবং হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের নকশায় শহীদ মিনারে আধুনিক স্থাপত্য ও নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। পঞ্চাশের দশকের শিল্পীদের মধ্যে মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম ও মুর্তজা বশীর বিমূর্ততার দিকে ঝুঁকে পড়লেও তাঁদের কাজে দেশজ অনুপ্রেরণা সব সময়ই বিদ্যমান ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। অধ্যাপক আবুল মনসুর তাঁর এই দীর্ঘ আলোচনা শেষ করেছিলেন চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোকপাত করে।

পরে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন শিল্পসমালোচক মঈনুদ্দিন খালেদ ও শিল্পী ঢালী আল মামুন।