দেশের বাজারে বছর বছর ফলের দাম বেড়েছে। আর তা স্বল্প আয়ের মানুষের নাগালছাড়া হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীর পথ্য হিসেবে মাল্টার চাহিদা বেশি। রাজধানীর বাজারে ২০২০ সালের জুলাইয়ে এক কেজি মাল্টার দাম ছিল ১২০-১৫০ টাকা। একই মাল্টা এখন বিক্রি হয় ৩৫০-৩৮০ টাকা কেজি। গত সেপ্টেম্বরে দাম আরও চড়া ছিল। কেজি ছিল ৪২০ থেকে ৪৫০ টাকা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) একটি প্রতিবেদন বলছে, মাল্টা, আপেল, নাশপাতি ও আঙুরের ওপর বছর বছর শুল্ক–কর বাড়িয়েছে সরকার। ফলে সরকারের আয় বেড়েছে। কিন্তু এসব ফল মানুষের নাগালছাড়া হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশি ফল যখন দামি হয়েছে, তখন দেশি ফল আর সস্তা থাকেনি। দেশি ফলের দামও বেড়েছে। যেমন এক হালি সাগর কলা ২০২০ সালের জুলাইয়ে ছিল ২০-২৫ টাকা। এখন তা ৪০-৫০ টাকা। আকারে ছোট হলে দাম কিছুটা কমে পাওয়া যায়। তবে চায়ের দোকান থেকে একটি সাগর কলা কিনে খেতে লাগে ১৫ টাকা।
বিষয়টি (ফলের কর কমানো) নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কাজ চলছে। এর বেশি আপাতত কিছু বলতে পারছি না।খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বাণিজ্যমন্ত্রী
প্রথম আলোতে গত ২১ সেপ্টেম্বর ফলের দাম নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল ‘এখন একটি মাল্টা ১০০ টাকা, একটি ডাব ১৫০-২২০’। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৩ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ফল ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি বৈঠক করে। এরপর ফলের শুল্ক–করভার এবং দাম নিয়ে একটি সুপারিশমূলক প্রতিবেদন তৈরির জন্য ট্যারিফ কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদনটি গত মঙ্গলবার জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের তাজা ফল আমদানিতে শুল্ক–করকাঠামো বিবেচনা করা হলে দেখা যায়, তাজা ফল বিলাসজাতীয় পণ্যের শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ ফল খাওয়া এখন বিলাসিতা।
তাজা ফলে শুল্ক–কর কমানোর কোনো উদ্যোগ আছে কি না জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি (ফলের কর কমানো) নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কাজ চলছে। এর বেশি আপাতত কিছু বলতে পারছি না।’
শরীরের পুষ্টির জন্য মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও ফল খাওয়া জরুরি। সাধারণত মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়লে শর্করাজাতীয় খাবার, তথা ভাত খাওয়া কমে এবং মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও ফল খাওয়া বাড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১০ অনুযায়ী, ওই সময় দেশে মাথাপিছু ফল গ্রহণ ছিল গড়ে ৪৫ গ্রাম। ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী, সেটা ৩৬ গ্রামে নামে। ২০২২ সালের জরিপ বলছে, ফল খাওয়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ দশমিক ৪ গ্রামে। যদিও বিবিএসের এই জরিপ নিয়ে প্রশ্ন আছে।
ফল খাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি কী, তা জানা সম্ভব হয়নি। কারণ, ২০২২ সালের পর আর খানা আয়-ব্যয় জরিপ হয়নি। তবে অনেকেই মনে করেন, মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফল খাওয়া কমেছে।
পুষ্টিবিদ ও বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অধ্যাপক এস কে রায় প্রথম আলোকে বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ মাছ, মাংস, ডিম কম খাচ্ছে, ফলে ভিটামিন-মিনারেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, একজন মানুষের দৈনিক ৪০০ গ্রাম ফল খাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে মানুষ ফল খেতে পায় অনেক কম।
একজন মানুষের দৈনিক ৪০০ গ্রাম ফল খাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে মানুষ ফল খেতে পায় অনেক কম।এস কে রায়, পুষ্টিবিদ
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি, আনার ইত্যাদি ফলে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) ইত্যাদি মিলিয়ে মোট করভার ছিল ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার ফলে শুল্ক–কর ছিল ৮৯ টাকা। এরপর তা বাড়তে বাড়তে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১২২ শতাংশ। মানে হলো, ১০০ টাকার ফলে ১২২ টাকা পায় সরকার।
ফলের এই করভার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। আপেল/নাশপাতির ওপর ভারতে ৬০-৬১, পাকিস্তানে ৬০-৮০, নেপালে ২৫-৩৫ ও শ্রীলঙ্কায় ৫০-৬০ শতাংশ শুল্ক–কর রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বৈঠকে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের চেয়ে বাংলাদেশ আপেল, মাল্টা, কমলা ও আঙুরের দাম বেশি। ভারতে তখন আপেলের কেজি ছিল ১৫০-২২০ টাকা, পাকিস্তানে ১১০-১৭০ টাকা এবং নেপালে ১৬০-২৪০ টাকা। বাংলাদেশে তখন ছিল ৩৮০-৪৮০ টাকা।
শুল্ক–কর বাড়ানো হয়েছিল ডলার–সংকটের কারণে। এখন সেই সংকট নেই। তাই ফলের শুল্ক–কর কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।সেলিম রায়হান, অর্থনীতিবিদ
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ফল থেকে সরকার রাজস্ব আয় করেছে ২ হাজার ৫৭০ টাকা টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
সরকারের রাজস্ব আয় বাড়লেও ফল আমদানি কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল ৮ লাখ মেট্রিক টন। তা সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে। আমদানি কমলেও সরকারের আয় বেড়ে দাম বেড়ে যাওয়ায়। অন্যদিকে শুল্ক–করের পাশাপাশি ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণেও ফলের দাম বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিদেশি ফলের আমদানি কমে গেলে প্রতিযোগিতা কমে। ফলে দেশি ফলের বিক্রেতারাও বাড়তি দাম আদায়ের সুযোগ পান।
অন্যদিকে অনেকে শারীরিক কারণে নির্দিষ্ট কিছু ফল খাওয়ার সুযোগ পান। যেমন অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গত সেপ্টেম্বরে প্রথম আলোকে বলছিলেন, তিনি আপেল ও নাশপাতি ছাড়া অন্য কোনো ফল খেতে পারেন না। অন্য ফল খেতে চিকিৎসক নিষেধ করেছেন।
শিশুরা অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ফল ছাড়া অন্য ফল খেতে চায় না। ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ওয়াহিদুর রহমান সেই সমস্যায় রয়েছেন। বেসরকারি এই চাকরিজীবী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ছয় বছরের ছেলে আপেল খেতে পছন্দ করে। প্রায়ই বলে বাবা আপেল এনো। আমি তো বলতে পারি না আপেলের কেজি ৪০০ টাকা, তা আনা যাবে না।’ তিনি বলেন, তিনটি পেয়ারায় এক কেজি হয়ে যায়। দাম ১২০ টাকা। প্রতিটির দাম পড়ে ৪০ টাকা। তাহলে দেশীয় ফলের দাম কম বলা যাবে কি?
আমার ছয় বছরের ছেলে প্রায়ই বলে বাবা আপেল এনো। আমি তো বলতে পারি না আপেলের কেজি ৪০০ টাকা, তা আনা যাবে না।ওয়াহিদুর রহমান, বেসরকারি চাকরিজীবী
ট্যারিফ কমিশন ফলের শুল্ক–কর কমানোর সুপারিশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, দেশে আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি ও আনারের পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক উৎপাদন নেই। ফলে শতভাগ আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা দেশীয় কোনো উদ্যান শিল্পের সুরক্ষায় প্রতিযোগিতা তৈরি করে না। ফলের ওপর বিলাসদ্রব্যের মতো উচ্চহারে শুল্ক–কর আরোপ কোনো সুরক্ষামূলক শুল্কনীতিকে সমর্থন করে না, বরং স্থানীয় বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যকে সাধারণ ও নিম্ন-আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দেয়। এতে বৈধ আমদানি কমে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, ফলকে বিলাসপণ্য হিসেবে গণ্য করার কোনো মানে নেই। শুল্ক–কর বাড়ানো হয়েছিল ডলার–সংকটের কারণে। এখন সেই সংকট নেই। তাই ফলের শুল্ক–কর কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে।