‘হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারা
‘হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারা

হাম নিয়ে বৈঠকে বক্তারা: তথ্য টিকার কাজ করে

হাম বিষয়ে সঠিক তথ্যের ঘাটতির কারণে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তথ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তথ্য ছাড়া কোনো উদ্যোগ ও পরিকল্পনা সফল হবে না। সঠিক তথ্য টিকার সমান। গণমাধ্যমসহ আগ্রহী সব পক্ষ যেন হাম বিষয়ে সঠিক তথ্য পায়, সে ব্যাপারে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। অন্যদিকে যাদের কারণে হামে শিশু মৃত্যু হচ্ছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

‘হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা। বিএনপির অঙ্গসংগঠন ‘নিপীড়িত নারী ও শিশু আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ এ বৈঠকের আয়োজন করে। আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারের সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক হয়। এতে শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, নারী স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, টিকাবিশেষজ্ঞ, চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ বক্তব্য দেন।

শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, মা–বাবা বা অভিভাবকদের এই বার্তা দিতে হবে যে হামে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ খাওয়াতে হবে। তিনি হামে আক্রান্ত শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, আইসিইউ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। মাথায় রাখতে হবে, আক্রান্ত শিশুদের বেশি দরকার অক্সিজেন, অক্সিজেনের নিশ্চয়তা বাড়াতে হবে। আইসিডিডিআরবি যে সাশ্রয়ী অক্সিজেন–ব্যবস্থা (বাবেল সি–প্যাপ) প্রবর্তন করেছে, সরকার সে ব্যাপারে চিন্তা করতে পারে।

শিশু কিডনির রোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, মানুষের মধ্যে যেন আতঙ্ক তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে সব পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। চিকিৎসার ব্যবস্থা উপজেলা পর্যায়ে না হলে মানুষ রোগী নিয়ে ঢাকায় আসবে। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরবে। সংক্রামক রোগ বলে অনেক হাসপাতাল রোগী ভর্তি করাবে না। এই জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক প্রতিটি হাসপাতালে হামের জন্য পৃথক ওয়ার্ড খোলার পরামর্শ দেন।

হাম নিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন ‘নিপীড়িত নারী ও শিশু আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ আয়োজিত বৈঠকে আলোচকদের একাংশ

কেন হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে একাধিক আলোচক বক্তব্য দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের টিকা ও প্রতিরোধ রোগবিষয়ক ন্যাশনাল প্রফেশনাল কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে দ্বিধা আছে, এটা কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

দরকার ঠিক সময়ে ঠিক তথ্য

গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকজন ব্যক্তি অনুষ্ঠানে কথা বলেন। নিউজ ব্রডকাস্টারস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশের (এনবিএ) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক সাকলায়েন রাসেল বলেন, কোভিড মহামারির সময়ে যেমন তথ্যের অপব্যবহার হয়েছিল, হামের প্রাদুর্ভাবের সময় তেমনই দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকার ব্যাপারে ব্যাপকভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, বলা হচ্ছে টিকা নেওয়ার দরকার নেই। এসব অপতথ্য প্রতিরোধের পাশাপাশি সরকারকে সঠিক তথ্য সরবরাহ করতে হবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব বা মহামারির সময় সত্যকে অস্বীকার বা তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা লক্ষ করা যায়। অনেকে দায়িত্বহীনভাবে অপতথ্য ছাড়াতে থাকে। তিনি বলেন, ‘অপপ্রচার, অপতথ্যের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী সংগঠন—সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’

রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা বলেন, তথ্যের ঘাটতি থাকলে ‘টার্গেটেড ইন্টারভেনশন’ করা যায় না। কত শিশু হামের টিকা পেয়েছে, কোন জেলায় টিকার ঘাটতি আছে, টিকা কতটুকু কার্যকর, কোথায় ভিটামিন এ পাওয়া যায়, কী পরিস্থিতি হলে একজন শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে, আইসোলেশন কীভাবে করতে হবে—এ ধরনের সব বিষয়ে সঠিক তথ্য থাকতে হবে, দেশের মানুষকে সরবরাহ করতে হবে, মানুষকে জানাতে হবে। তা না হলে মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

এই তিনজনসহ আলোচনায় অংশ নেওয়া আরও কয়েকজন হাম নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

আইনের আওতায় নিতে হবে

অনুষ্ঠানের শেষ আলোচক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, অভিযোগ আছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকার ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি তারই পরিণতি। তখন কী হয়েছিল তার তদন্ত হওয়া দরকার। দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে উদাহরণ সৃষ্টি করা দরকার। তা হলে ভবিষ্যতে এমন আর হবে না।

এর আগে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এমিনেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ শামীম হায়দার তালুকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার টিকার ব্যাপারে হেলাফেলা করেছে। তারা শিশু পুষ্টি, শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পান—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়নি। তাদের ভুলে এখন শিশুদের মৃত্যু হলে তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।

স্বাগত বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল সুমন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম, ওজিএসবির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ফিরোজা বেগম, বাংলা ভিশনের প্রধান সম্পাদক আবদুল হাই সিদ্দিক, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক আতিয়ার রহমান।