
দিনের শুরুতে ‘মা’ ছিল সাদা রঙের। বেলা শেষে ধানমন্ডির সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠের মাঝে দাঁড়ানো বিশালাকারের সেই ‘মা’ অগুনতি কচিকাঁচার রংমাখা হাতের ছাপে হয়ে উঠল বর্ণিল। গতকাল শুক্রবার এই ‘মা’ শব্দটির পাশে নিজের মাকে সঙ্গে নিয়ে ছবি তুলতেও ব্যতিব্যস্ত দেখা গেল আদরের সন্তানদের।
অক্ষরের ‘মা’ আর বাস্তবের মা তো ছিলেনই, আরও ছিল আনন্দে মেতে ওঠার হরেক রকম আয়োজন। শুধু তা–ই নয়, নিজেদের সৃজনী প্রতিভা বিকাশের ব্যবস্থাও ছিল বর্ণমেলায়। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বর্ণমালাকে কেন্দ্র করে ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও দেশাত্মবোধে উদ্ভাসিত দিনভর এ আয়োজন ছিল প্রথম আলোর। বর্ণমেলার পৃষ্ঠপোষক ছিল স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের ব্র্যান্ড মেরিল বেবি। সহায়তা দিয়েছে সেপনিল, সুপার মম এবং প্রচার সহযোগী এটিএন বাংলা। মেলার স্লোগান ছিল, ‘মেতে ওঠো দুরন্ত শৈশবে’।
সকাল নয়টায় ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠের দক্ষিণ প্রান্তে স্থাপিত শহীদ মিনারে ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। শিল্পী আফজাল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর, অভিনয়শিল্পী সাবিলা নূর, স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং জেসমিন জামান, শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক শিশু-কিশোরদের নিয়ে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
সূচনা বক্তব্যে সাজ্জাদ শরিফ বলেন, প্রথম আলোর আয়োজনে ২০১০ সাল থেকে শুরু হয়েছে বর্ণমেলা। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য নিয়ে এই আয়োজনে আনন্দের সঙ্গে সবার দিন কাটবে।
আফজাল হোসেন বলেন, তিনি প্রতিবছর এ উৎসবে যোগ দেন। বিশেষ করে শিশুদের হাতেখড়ি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের লিখতে শেখানো খুবই আনন্দের। শিশুরা যেন সঠিকভাবে মাতৃভাষা শিখতে ও বলতে পারে, সে বিষয়ে শৈশব থেকেই তাদের প্রতি যত্ন নিতে অভিভাবকেদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
তারিক মনজুর বলেন, শিশুদের প্রমিত উচ্চারণ শেখার ব্যবস্থা পাঠ্যপুস্তকে নেই। ভাষার প্রতি তাদের আগ্রহী করে তুলতে প্রথম আলো বর্ণমেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকে। এতে চেষ্টা থাকে নতুন প্রজন্মকে ভাষা ও দেশাত্মবোধে অনুপ্রাণিত করার।
সাবিলা নূর বলেন, তিনি এবারই প্রথম এ অনুষ্ঠানে এলেন। সকাল থেকেই মাঠভরা শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
জেসমিন জামান বলেন, মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার গৌরবময় ইতিহাসের এই দিনে এমন একটি আয়োজন অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। স্কয়ার টয়লেট্রিজ এর সঙ্গে থাকতে পেরে আনন্দিত।
সমাপনী বক্তব্যে আনিসুল হক অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোর, তাদের অভিভাবক ও সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের চেতনা এখনো আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল রয়েছে।
সাংস্কৃতিক পর্ব
সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী শেষে মঞ্চে শুরু হয় বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক পর্ব। সহজপাঠ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। এক্সেল একাডেমির শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল ‘নাচি মোরা ফুলে ফুলে’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য। নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর ‘সোনা সোনা সোনা’ সম্মেলক গান আর ব্রতচারী নৃত্য পরিবেশন করে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ছিল ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে ভরে গেছে’ কবিতার সঙ্গে ‘আমি বাংলার গান গাই’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ গান দিয়ে সুন্দর গীতি-আলেখ্য।
মঞ্চে যখন চলছিল নৃত্যগীতের পরিবেশনা, তখন ক্রীড়া কমপ্লেক্স ভবনের নিচে হচ্ছিল একের পর এক প্রতিযোগিতা। কোথাও খুদে আঁকিয়েরা লিখছিল সুন্দর বর্ণমালা। কোথাও সুন্দর লেখা। কোনো স্টলে আবার রং-তুলি নিয়ে ভবিষ্যতে জয়নুল–কামরুলের দল মেতে উঠেছিল মাটির সরা ও টি-শার্টে নকশা আঁকায়। সেপনিলের স্টলে ছিল কাদামাটি নিয়ে মনের সুখে পুতুল তৈরির আয়োজন। নবীনদের হাতেখড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল একটি স্টলে।
মাঠের কিনার দিয়ে তৈরি করা হয় স্টলের সারি। সেখানে টি-শার্ট, বিভিন্ন ধরনের পুতুল, হস্তশিল্পসামগ্রী, কাগজের তৈরি খেলনা, বিজ্ঞানচর্চার উপকরণ, ছিল এমন অনেক কিছু। প্রথমা প্রকাশনের স্টলে ছিল শিশুতোষ বই। আরও ছিল বিজ্ঞানচিন্তা, কিশোর আলো ও মেলার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্টল। খাবারের স্টলও ছিল অনেক।
বর্ণমেলাকে বর্ণাঢ্য আর আকর্ষণীয় করে তুলতে যুক্ত করা হয় বহুবিধ উপকরণ। ছিল নাগরদোলা। ডাকটিকিটে বর্ণমালা, বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি বর্ণমালা ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ছবির প্রদর্শনী। বর্ণাঙ্কন, বর্ণলিখন, বর্ণকারিগর ও প্রিয়জনের কাছে চিঠি প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন শিল্পী আবদুল মান্নান, ফারেহা জেবা ও আনিসুজ্জামান সোহেল। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে জা এন জি আইসক্রিম, শক্তি, ড্যান কেক ও ফ্রুটিকা খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে। চিকিৎসাসেবায় ছিল ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
মেলায় সপরিবার
মাঠের মধ্যে করা হয়েছিল অনেক বড় আকারের বাঘবন্দী, সাপলুডুর ছক। সুপারিগাছের শুকনো পাতা ছিল বেশ কিছু। এর গোড়ার দিকের চওড়া অংশের ওপর সন্তানদের বসিয়ে বাবা-মায়েরা অপর প্রান্ত ধরে ঘাসভরা মাঠের ওপর টেনে নিয়েছেন। লোহার রিং চালানোর ব্যবস্থা ছিল। শহুরে শিশুদের এমন রিং চালানোর সুযোগ হয় না। অনেক বাবাকে দেখা গেল সন্তানকে রিং চালানোর কৌশল শেখানোর পাশাপাশি নিজেই রিং নিয়ে ছুটতে ছুটতে ফিরে যাচ্ছিলেন ফেলে আসা শৈশবে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে এসেছিলেন বর্ণমেলায়। নারায়ণগঞ্জ থেকে ফারজানা আলী এসেছেন দুই মেয়ে মরিয়ম আক্তার ও মাইমুনা আক্তারকে নিয়ে। তিনি বললেন, খুব সকাল উঠে সারা দিনের প্রস্তুতি নিয়ে মেলায় এসেছেন।
সরকারি সংগীত কলেজের সহকারী অধ্যাপক লাবণী সাহা এসেছিলেন সপরিবার। তাঁর ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিজিৎ সাহা সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চূড়ান্ত পর্বে উঠছে। তিনি বললেন, শুধু আনন্দ নয়, এখানে শিশুদের প্রতিভা বিকাশের বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা থাকে। এটা তাঁর কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।
ওদিকে মেলামঞ্চে ছিল একের পর এক আকর্ষণীয় পরিবেশনা। স্কুলশিক্ষার্থীদের পর্বের পরে পাপেট শো। ঢাকা পাপেট থিয়েটার, গুফি ওয়ার্ল্ড, জলপুতুল তাদের মজার মজার পাপেট শোতে শিশুদের সঙ্গে বড়দেরও মাতিয়ে রাখে।
মঞ্চে এল মেট্রোরেল
এরপর মঞ্চে উঠে এল মেট্রোরেল। অবাক হওয়ার মতো ঘটনাই বটে। আস্ত এক মেট্রোরেল চলেফিরে বেড়াচ্ছে মঞ্চে। তার পিছু পিছু এল এক লাল রঙের ডাকবাক্স, তারপর একে একে এল বাউল, সাপুড়ে, যাত্রার রাজা, পাহাড়ি মেয়ে থেকে শুরু করে চব্বিশের গণ-আন্দোলনের শহীদ মুগ্ধ। এভাবেই যেমন খুশি তেমন সেজে ৩৫ প্রতিযোগী এল মঞ্চে। বিচারকেরা বাছাই করলেন সেরা দশ। সঞ্চালক ছিলেন সাইদুজ্জামান রওশন ও মাহবুবা সুলতানা।
গানে গানে
বেলা আড়াইটায় শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব রোবটের সঙ্গে শিশুদের নাচ দিয়ে। এরপর দেশাত্মবোধক গানের প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশের ১ হাজার ১২৩ জন প্রতিযোগী গানের ডেমো জমা দিয়েছিল। সেখান থেকে চূড়ান্ত পর্বে আসে ১১ জন। ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙালি’ গেয়ে প্রথম হয় সরকার একান্ত ঐতিহ্য, ‘ও আমার বাংলা মা’ গেয়ে দ্বিতীয় হয়েছে অরিত্র বসাক ও ‘লাখো লাখো শহীদের রক্তমাখা’ গেয়ে তৃতীয় হয়েছে বিদ্যাস্তুতি সিংহ। বিচারক ছিলেন শিল্পী দিলশাদ নাহার কণা, ওয়ার্দা আশরাফ ও গীতিকার কবির বকুল।
গানের পর জাদুর চমক দেখিয়ে মুগ্ধ করেন জাদুকর স্বপন দিনার। এরপর সব প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণীর মধ্য দিয়ে শেষ হয় সারা দিনের আনন্দ আয়োজন।