
দেশে গুমের সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করতে কার্যকর ও স্বচ্ছ আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের আইনের চেয়েও খারাপ হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দুর্বল আইন করা হলে দেশে আবারও গুমের সংস্কৃতি ফিরে আসতে পারে।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে নতুন আইন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার আইনের চেয়েও জঘন্য হয়েছে। এই আইন দিয়ে বাংলাদেশে গুম প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। মনে হচ্ছে, যারা গুমের সঙ্গে জড়িত ছিল, তারাই আইনগুলো লিখিয়েছে।’
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিরা ও এখনো নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘শক্ত কণ্ঠে সরকারকে বলছি, দয়া করে এমন কিছু করবেন না, যেটা বাংলাদেশের গুমের সংস্কৃতিকে আবার ফিরিয়ে আনবে। এই “নাই হয়ে যাওয়ার” ঘটনা যদি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পায়, অপরাধীদের যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত না করা হয়, তাহলে কিসের বিপ্লব? সেই বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে যাবে।’
গুমের বিচার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না উল্লেখ করে সাবেক এই প্রসিকিউটর বলেন, যাঁরা এই অন্ধকার অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল, তাঁদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের অপরাধ ঘটবে।
গুমের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে যে কেউ এর শিকার হতে পারেন বলে মনে করেন তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আজকে আমি নিরাপদ আছি, কালকে হয়তো আমি নাই হয়ে যাব। পরশু আমার সন্তানেরা নাই হয়ে যাবে। ক্ষমতায় কেউ চিরদিন থাকে না। আজ যাঁরা মন্ত্রী-এমপি আছেন, তাঁরাও একদিন ক্ষমতায় থাকবেন না।’
বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানসহ গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও গুম করা হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে থানার একজন উপপরিদর্শক (এসআই) দিয়ে তদন্ত করানোর বিধানেরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে একজন এসআই কীভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত করবেন? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তেই আমরা নানাভাবে বাধার মুখে পড়েছি।’
গুম বা খুন করতে না পারে, সে জন্য কার্যকর ও স্বচ্ছ আইন দরকার
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার রক্ষা, স্বাধীন বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে ফাঁকা বুলির আইন না নিরেট এবং স্বচ্ছ আইন দরকার। যারা ১৬টা বছর ধরে গুম এবং খুন করেছে, তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রসঙ্গ টেনে আখতার হোসেন বলেন, ‘বাহিনীগুলোর একটি ছোট অংশ গুমের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাদেরও বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। কয়েকজন জড়িত মানে এই নয় যে পুরো বাহিনী জড়িত। বাংলাদেশে যেন আর কেউ গুম বা খুন করতে না পারে, সে জন্য কার্যকর ও স্বচ্ছ আইন করতে হবে।’
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য শরিফুল ইসলাম বলেন, মানুষ এত বোকা নয়, মানুষ সবই দেখছে। বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা নষ্ট করে ফেললে সবাইকে এর মূল্য দিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, মানবাধিকার কমিশনকে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কমিশনকে অকার্যকর করে ফেলা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, গুমের শিকার সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমান, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা জাহিদ হোসাইন, মানবাধিকারকর্মী নাবিলা ইদ্রিস প্রমুখ।
বৈঠকে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা স্বজনদের সন্ধান ও বিচার চেয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো অনেক ঘটনার সুরাহা হয়নি। তাঁরা দ্রুত বিচার ও কার্যকর আইনের দাবি জানান।