রাজধানীর উত্তরায় বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের উড়ালসড়কের গার্ডারের চাপায় প্রাইভেট কারের নিহত পাঁচ আরোহী নিহত হয়েছেন। ভয়াবহ এ ঘটনায় বড় মাপের এ নির্মাণকাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই দুর্ঘটনা, প্রকল্প ও এর নিরাপত্তাব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন যোগাযোগবিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের ও অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্থ শঙ্কর সাহা।

প্রথম আলো: রাজধানীর উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হলেন। একটি পরিবার গাড়ি করে রাস্তায় বের হয়ে দুর্ঘটনার মুখে পড়ল। কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারালেন। কী বলবেন এটা নিয়ে?
মো. হাদিউজ্জামান: এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক ঘটনা। গণমাধ্যমে এটাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। আমি বলব, এটা দুর্ঘটনা নয়, অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। দুর্ঘটনা হচ্ছে সব রকম প্রস্তুতি থাকার পরও যান্ত্রিক বা অন্য মানবিক নানা ভুল বা ত্রুটির কারণে সৃষ্ট ঘটনা। কিন্তু উত্তরার ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
প্রথম আলো: দুর্ঘটনার ধরন দেখে আপনার কী মনে হয়েছে? নির্মাণকাজের সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছে?
মো. হাদিউজ্জামান: গার্ডার তুলতে যে ক্রেন ব্যবহার করা হয়েছে, এটাকে ‘ক্রলার ক্রেন’ বলা হয়। গার্ডার বা ভারী কোনো জিনিস তোলার সময় ক্রেনের ব্যবহারের সময় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এসব কাজের সময় ক্রেন উল্টে পড়া বা গার্ডার পড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। ক্রেন থেকে গার্ডার পড়ে যেতেই পারে। কিন্তু এর ফলে যেন প্রাণহানি না হয়, তার জন্য নিরাপত্তাবেষ্টনী অত্যাবশ্যকীয় একটি শর্ত। কিন্তু এত বড় একটা কাজ, সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারের একটি কাজে যে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না। যখন কোনো ড্রেন সংস্কারের মতো কাজ হয়, সেখানেও কোনো ফিতা দিয়ে এলাকা ঘিরে রাখা হয়। দুই পাশে লোকবল রাখা হয় ব্যবস্থাপনার জন্য। আর এখানে এত বড় ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হচ্ছে, সেখানে নিরাপত্তাবেষ্টনী বলতে কিছু ছিল না। বিষয়টাকে একেবারেই অবহেলা করা হয়েছে।
প্রথম আলো: দুর্ঘটনাটির ধরন সম্পর্কে কিছু বলবেন?
মো. হাদিউজ্জামান: ক্রেন যেভাবে পড়ে গেছে, এটাকে আমরা বলি ‘টিপিং ফেইলিওর’। এর মানে হলো, ক্রেনের যে সক্ষমতা, সে অনুযায়ী সেটি কাজ করতে পারেনি। ক্রেনের সর্বোচ্চ একটি সক্ষমতা থাকে। ক্রেন ঘোরানো, কত ব্যাসার্ধে তা ঘোরানো হচ্ছে, এসব বিষয় কিন্তু বিবেচ্য। কারণ, যখন মালামাল তোলা হচ্ছে, তখন ক্রেনের ‘লিমিটিং ক্যাপাসিটি’ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে আসতে পারে; অর্থাৎ ৮০ টনের সক্ষমতার একটি ক্রেনের সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ টনে নেমে আসতে পারে। আমার ধারণা, গার্ডারের ওজন ছিল ৫০ টন। কিন্তু ক্রেনের লিমিটিং ক্যাপাসিটি কমে গিয়েছিল যখন এটা তোলা হচ্ছিল। দেখতে হবে, যিনি এটা চালাচ্ছিলেন, তাঁর দক্ষতা ছিল কি না। তাঁর লাইসেন্স ছিল কি না, সেটাও দেখতে হবে। তবে বড় কথা হচ্ছে, ক্রেনের এ ধরনের দুর্ঘটনা হতেই পারে। হতে পারে বলেই আমরা এর প্রভাবক অঞ্চল কতটুকু, তা নির্দিষ্ট করে দিই। এর একটি কর্মপরিকল্পনা থাকে। ওয়ার্ক টু পারমিট বলে একটি কথা আছে; অর্থাৎ কাজ করার আগে কর্তৃপক্ষের কাছে একটা অনুমতি নিতে হবে, যেখানে তাদের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করা থাকবে। কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেবে। সেটা মেনে চলা হয়েছিল কি না, সেটাও দেখার বিষয়।
প্রথম আলো: দুর্ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যেই ক্রেনের পাশ দিয়ে নিয়মিত গাড়ি যাতায়াত করছিল। কী বলবেন এ বিষয় নিয়ে?
মো. হাদিউজ্জামান: এটা স্রেফ অবহেলা। দিনে হোক রাতে, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি গ্রাহ্য করা যাবে না। অনেকে বলছেন, দিনে কাজ না করে রাতে করলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। এটা অগ্রাধিকারমূলক একটি কাজ। এটা রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা হতে পারে। যখনই কাজ করবেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি থাকতেই হবে। সেগুলো ছিল না বলেই এই প্রাণহানি বা হত্যার ঘটনা ঘটল।
প্রথম আলো: নির্মাণকাজ শুরুর পর এ পর্যন্ত বিআরটির উড়ালপথ তৈরির গার্ডার ধসে চারটি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও তা নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দোষটা কার আসলে?
মো. হাদিউজ্জামান: আমাদের বিআরটি প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যেসব মানদণ্ড বজায় রেখে নির্মাণকাজ করা হয়, তার ন্যূনতম কোনো কিছু এ প্রকল্পে মেনে চলা হয়নি। এ প্রকল্পের শুরু থেকে আমরা একেবারে কাছে থেকে দেখেছি। শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাসহ প্রতিটি বিষয়ে গাফিলতি দেখা গেছে। তবে শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কথা বলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। এসব ঠিকাদারি সংস্থার কাজ দেখভাল করার জন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থার বা সরকারের প্রতিনিধি আছে। সেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকবলসহ নানা ঘাটতি থাকতেই পারে। আর এ ঘাটতি মেটাতে একটি তৃতীয় পক্ষ আছে, যাদের ‘সুপারভিশন কনসালট্যান্ট’ বলা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিশ্রুতিমতো কাজ করছে কি না, তার দেখভাল করার জন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সুপারভিশন কনসালট্যান্টরা রয়েছেন। তাই এ ঘটনায় ঠিকাদারি সংস্থার পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সুপারভিশন কনসালট্যান্টদের অবহেলার বিষয়ও খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রথম আলো: এখন নানা ধরনের নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের একটা দায় তো আছেই। কিন্তু তাদের দেখভালকারী কর্তৃপক্ষ যারা আছে, তারা কী দায় এড়াতে পারে?
মো. হাদিউজ্জামান: অবশ্যই দেখভালকারী কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রবণতা হলো, তারা ব্যয় সাশ্রয়ের চেষ্টা করে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত থাকে, তা তারা মেনে চলতে বাধ্য। এর জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ থাকে। এ প্রকল্পের জন্য প্রতি কিলোমিটারে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ আছে। তারা মাসে মাসে এ অর্থ ঠিকই নিচ্ছে। কিন্তু এসব অর্থ নিয়েও তারা কতটুকু কাজ করছে, তার নজরদারি করবে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ ও সুপারভিশন কনসালট্যান্টরা।
প্রথম আলো: ঢাকা বিআরটি প্রকল্প ধীরগতির কাজেরও নজির তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে ৫ বছরের প্রকল্প প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ চলছে। গত জুলাই পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ। এর মধ্যে ব্যয় বেড়েছে ১০৯ শতাংশ, যা টাকার অঙ্কে ২ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ না করা সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। এসব কেন ঘটে?
মো. হাদিউজ্জামান: এখানে একটা ‘উইন উইন সিচুয়েশন’ আছে দুই পক্ষের জন্য। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারলেও সময় বাড়িয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এতে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে যেসব ব্যক্তি আছেন, তাঁরা প্রকল্পের জন্য যে সুবিধা ভোগ করেন, যেমন বড় বড় গাড়ি বা অন্যান্য সুবিধাও চালু থাকে। কারও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। এখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের অভিন্ন স্বার্থ থাকে। তাদের কারও কোনো দায়বদ্ধতা থাকছে না, এসব নিয়ে কোনো প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে না। বিআরটি কোনো রকেট সায়েন্স নয়। বিশ্বের ১৮০টি দেশে এখন এ প্রকল্প আছে। এখানে আমাদের এই প্রকল্প দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে শেষ করা যুক্তিযুক্ত ছিল বলে আমার মনে করি। আশপাশের দেশে দেড়-দুই বছরের মধ্যে কাজ করে ফেলে। এখানে কোনো জবাবদিহি না থাকাতেই এসবের মেয়াদ ইচ্ছেমতো বাড়ানো হয়।
প্রথম আলো: বড় নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কোন কোন শর্ত পালন করতে হবে?
মো. হাদিউজ্জামান: আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে যে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত হয়, সেখানে ফিডিক আইন (দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স) মেনে চলার বাধ্যবাধকতা আছে। সেগুলো মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। এ আইন অনুযায়ী, যথাযথ নিরাপত্তা মেনে চলতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। আমাদের এখানে দুর্ঘটনা হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এ থোক বরাদ্দ দিয়ে কাজ হবে না। ফিডিক আইন অনুযায়ী এর ব্যবস্থা হতে হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী। নিরাপত্তাবেষ্টনী, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, প্রকল্পের মালামালের রক্ষণাবেক্ষণ—এসব বিষয় শর্ত অনুযায়ী হচ্ছে কি না, মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে দেখতে হবে।