
চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত ৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। এই প্রথমবার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ছয়জন প্রতিযোগীর সবাই পদক পেয়েছেন। ১টি রৌপ্য ও ৫টি ব্রোঞ্জপদক জিতে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৯তম স্থান অর্জন করেছে। এবারের আসরে বাংলাদেশ দল মোট ১২১ নম্বর পেয়েছে, যা এখন পর্যন্ত এ প্রতিযোগিতায় দেশের সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর।
আজ সোমবার বিকেল চারটায় সাংহাই হাইস্কুলের গ্র্যান্ড অডিটোরিয়ামে এক জমকালো সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গণিতের এই বিশ্ব আসরের পর্দা নামে। অনুষ্ঠান শেষে প্রথা অনুযায়ী আয়োজক দেশ চীনের পক্ষ থেকে পরবর্তী আয়োজক হাঙ্গেরির বুদাপেস্ট কর্তৃপক্ষের হাতে আইএমওর অফিশিয়াল পতাকা তুলে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ দলের হয়ে এবার একমাত্র রৌপ্যপদকটি অর্জন করেছেন চট্টগ্রাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রায়হান সিদ্দিকী। তিনি ৪২ নম্বরের মধ্যে ২৩ পেয়েছেন। ব্রোঞ্জপদক পেয়েছেন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহসিন খান (২২ নম্বর), রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী এম জামিউল হোসেন (২১ নম্বর), ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী জাওয়াদ হামীম চৌধুরী (১৯ নম্বর), ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মনামী জামান (১৯ নম্বর) এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মারজুক রহমান (১৭ নম্বর)।
বাংলাদেশ দল এবার ২২তম বারের মতো আইএমওতে অংশ নিয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ১টি স্বর্ণপদক, ৮টি রৌপ্যপদক, ৪৫টি ব্রোঞ্জপদক ও ৪৭টি সম্মানজনক স্বীকৃতি লাভ করেছে।
এবারের আসরে ৪২ নম্বরের মধ্যে ২৯ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া ৫৫ শিক্ষার্থী স্বর্ণপদক, ২৩ বা তার বেশি পাওয়া ১০৫ জন রৌপ্যপদক এবং ১৬ বা তার বেশি পাওয়া ১৮৯ শিক্ষার্থী ব্রোঞ্জপদক পেয়েছেন। আসরে পূর্ণ ৪২ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন ৭ শিক্ষার্থী। তাঁরা হলেন যুক্তরাজ্যের অ্যালেক্স চুই, চীনের লেয়ান দেং, চে লিউ ও বোলুন ঝাং, দক্ষিণ কোরিয়ার হিয়নজুন লি এবং যুক্তরাষ্ট্রের লিয়াম রেডি ও আলেকজান্ডার ওয়াং।
যুক্তরাজ্যের অ্যালেক্স চুই আইএমওর ইতিহাসে রেকর্ড গড়ে টানা পাঁচবার স্বর্ণপদক জয় করেছেন। তাঁর হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন আইএমও সভাপতি অধ্যাপক গ্রেগর ডোলিনার। এ ছাড়া নারী প্রতিযোগীদের নৈপুণ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ রাশিয়ার আরিনা প্রোকুদিনাসহ পাঁচ মহাদেশের পাঁচজনকে ‘মির্জাখানি অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
দলীয়ভাবে ২৩২ নম্বর পেয়ে চীন প্রথম, ২০৭ নম্বর পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় এবং ১৯৬ নম্বর পেয়ে রাশিয়া তৃতীয় হয়েছে। এবার ১১৭টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৬৬৬ জন শিক্ষার্থী মেধার এই লড়াইয়ে অংশ নেন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক গ্রেগর ডোলিনার বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ভীষণ পরিশ্রম করেছে এই প্রতিযোগিতায়। সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। গত কয়েক দিনে অনেকেই নিজের মেধা প্রমাণ করেছে। সব শিক্ষার্থীরই এমন আয়োজনে অংশ নেওয়ার জন্য গর্বিত হওয়া উচিত। এবারের আয়োজনে আমাদের প্রত্যাশা ছাপিয়ে গেছে।’
ভিডিও বার্তায় ২০২৭ সালের আয়োজক দেশ হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে সবাইকে আমন্ত্রণ জানান ২০১১ সালের অ্যাবেল প্রাইজজয়ী গণিতবিদ ল্যাজলো লোভাজ। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি যখন অংশ নিই, তখন দেশ ছিল ৮টি, এখন ১০০টির বেশি দেশ অংশ নেয়। আইএমও অংশগ্রহণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের অনেক অনুপ্রাণিত করে।’
সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে আয়োজিত গালা ডিনারে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরেন। আগামীকাল শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ দেশে ফিরতে শুরু করবেন।
উল্লেখ্য, ১৯৫৯ সালে রোমানিয়ায় প্রথম শুরু হওয়া এই আয়োজনে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর অংশ নেয় বাংলাদেশ গণিত দল। দল নির্বাচন ও এর আনুষঙ্গিক আয়োজন করে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।