রোজার মাসে প্রতি কাপে দুই টাকা ছাড় দিয়ে চা বিক্রি করছেন চট্টগ্রাম নগরের এক ভাসমান দোকানি। তাঁর নাম সরোয়ার আলম। ষাটোর্ধ্ব এই বিক্রেতা প্রায় ৩২ বছর ধরে চা বিক্রি করে আসছেন চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়াম এলাকার ফুটপাতে।
চা বিক্রির টাকা জমিয়ে ২০১৬ সালে হজ করেছিলেন সরোয়ার আলম। তাই তাঁকে অনেকেই ডাকেন হাজি সরোয়ার। তবে সব সময় হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকেন বলে মিঠা কাকু নামেই বেশি পরিচিত তিনি।
ভাসমান দোকান হলেও ভালো মানের গুঁড়া দুধ ও চা–পাতা ব্যবহার করার কারণে স্টেডিয়াম পাড়ায় চা বিক্রেতা হিসেবে সুনাম রয়েছে তাঁর। রোজার মাসে সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চা বিক্রি করেন তিনি। প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কাপ চা বিক্রি হয় তাঁর ভাসমান দোকানে।
রোজা উপলক্ষে চায়ের দাম কমানোর বিষয়ে সরোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, রোজায় সব ধরনের দোকানে দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। এ প্রবণতার কারণে তাঁর মতো নিম্ন আয়ের মানুষকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়। রোজায় তাঁর দেখাদেখি অন্যরাও যাতে মূল্য ছাড়ে উৎসাহী হয়, সে লক্ষ্যেই চায়ের দাম কমিয়েছেন তিনি।
সরোয়ার বলেন, ছাড় দেওয়ার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ টাকা কম আয় হচ্ছে তাঁর। এরপরও চায়ের দামে ছাড় দিতে পেরে তিনি সন্তুষ্ট।
সরোয়ার আলম বলেন, ‘টাকা কম পেলেও মানুষের দোয়া তো পাচ্ছি। এটাই আমার জন্য অনেক কিছু।’
গতকাল রোববার রাত নয়টার দিকে সরেজমিনে সরোয়ার আলমের ভাসমান দোকানটিতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে টিনের একটি বাক্স পেতে দোকান করছেন তিনি। বাক্সের ওপরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে চায়ের কাপ ও বিস্কুট ভর্তি বয়াম। পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে সুতা দিয়ে একটি কাগজ ঝোলানো রয়েছে। কাগজে লেখা— ‘পবিত্র মাহে রমজানের সম্মানার্থে প্রতি কাপ চা ১০ টাকা।’
দোকানি সরোয়ার আলম বলেন, স্টেডিয়াম পাড়ায় প্রতি কাপ আট আনায় চা বিক্রি শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু চা বানানোর উপকরণের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দোকানে চায়ের দামও বেড়ে যায়। প্রায় দুই বছর ধরে প্রতি কাপ ১২ টাকায় চা বিক্রি করে আসছেন তিনি। রোজা উপলক্ষে কেবল এক মাসের জন্য ১০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরোয়ার আলমের ভাসমান দোকানটির সামনে আড্ডা দিতে দেখা যায় ২০-২৫ জন মানুষকে। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণ। চা পান করতে করতে আড্ডা দিচ্ছিলেন তাঁরা। কিছুক্ষণ পরপর পথচারীরাও এসে চা চেয়ে নিচ্ছেন সরোয়ার আলমের দোকান থেকে।
দোকানের সামনে আড্ডারত আহমেদ রেজা নামের এক তরুণের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি সরোয়ার আলমের দোকানের সামনে আড্ডা দেন। সরোয়ার আলমের বানানো চা তিনি এবং তাঁর বন্ধুদের কাছে অনেক পছন্দের।
আহমেদ রেজা বলেন, ‘একজন চা দোকানি রমজান মাসে মূল্যছাড় দিয়ে যে উদারতা দেখিয়েছেন, সে উদারতা অনেক ধনী ব্যবসায়ীদের নেই। রমজান এলেই তো সবাই মূল্য বাড়ানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেন। আমরা মিঠা কাকুর এ উদারতা থেকে সবাই শিক্ষা নিতে পারি।’
নগরের মাদারবাড়ি থেকে আসা তরুণ মোহাম্মদ ফাহিম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবে বিভিন্ন দেশে বিশেষ ছাড়ে পণ্য বিক্রি করতে দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এ চর্চা খুবই কম। চা বিক্রেতা সরোয়ার আলমের মতো সবাই নিজ নিজ পেশা থেকে এগিয়ে এলে দেশের মানুষ উপকৃত হতো।
সরোয়ার আলমের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। ১৯৭৩ সাল থেকে তিনি চট্টগ্রাম নগরে বসবাস করে আসছেন। সরোয়ার আলম জানান, তিনি থাকেন চট্টগ্রাম নগরের ধনিয়ালাপাড়ায়। এক ছেলে, এক মেয়ে রয়েছে তাঁর। ছেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পাস করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। মেয়ে নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন।