বাড়তি আয়ের আশায় বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে পতাকা বিক্রি করতে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসেছেন অনেকে।

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়েন তামিম বাদশা। দুই দিন আগে তাঁরা দুই ভাই ঢাকায় এসেছেন, উদ্দেশ্য বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের পতাকা বিক্রি করা।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে কথা হয় তামিমের সঙ্গে। হেঁটে হেঁটে পতাকা বিক্রি করছিলেন তিনি। নিজের গায়ে জড়িয়েছেন ব্রাজিলের হলুদ জার্সি। আর তাঁর হাতে থাকা বাঁশের লম্বা লাঠিতে বাঁধা রয়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা। কাঁধে ঝোলানো আরেকটি ব্যাগ। তাতেও বিভিন্ন দেশের শখানেক পতাকা।
কথায়–কথায় তামিম বলেন, ‘পরিবারের অবস্থা বেশি ভালা না। বাবার ভাঙারির ব্যবসা। যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার ঠিকঠাক চলে না। পড়াশোনার ফাঁকে ঢাকায় এসে পতাকা বেচছি। যা আয় হবে, কয়ডা দিন আরামে চলতে পারমু।’
তামিমের মামা মুসা তালুকদার ফার্মগেটে কখনো জামাকাপড়, কখনো শিশুদের খেলনাসামগ্রী বিক্রি করেন। থাকেন কাছেই একটি মেসে। সেই মেসেই উঠেছেন তামিম ও তাঁর ভাই তানভীর বাদশা। মামার পরামর্শে বাড়তি আয়ের আশায় দুই ভাই ঢাকায় এসেছেন। বিশ্বকাপ শেষে আবার বাড়ি ফিরে যাবেন।
বিক্রি কেমন—জিজ্ঞাসা করতেই মুচকি হাসি দিয়ে তামিম বলেন, বেচাকেনা এখনো সেভাবে জমেনি। খেলা শুরু হলে বিক্রি আরও বাড়বে। তারপরও যা হচ্ছে খারাপ না। দুপুরের পর থেকে আড়াই ঘণ্টায় ১ হাজার ৫০০ টাকার পতাকা বিক্রি করেছেন। এতে ৫০০ টাকার মতো লাভ থাকবে।
তামিম জানান, তাঁর মামা রাজধানীর চকবাজার থেকে পাইকারি পতাকা কেনেন আর তাঁরা দুই ভাই রাস্তায় সেগুলো বিক্রি করেন। গতকাল দুপুরে তিনি প্রথমে যান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, সেখান থেকে কাঁটাবন ঘুরে শাহবাগে এসেছেন।
দুই দিনে পতাকা বিক্রির অভিজ্ঞতায় তামিম বাদশার মনে হচ্ছে, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বাদ হলেই ব্যবসা শেষ। এ দুই দল যত দিন থাকবে, বিক্রিও তত দিন থাকবে। তাই এ দুই দলের কেউ যেন বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়, এটিই তাঁর চাওয়া।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপ থেকে...
ধানমন্ডিতে পতাকা বিক্রি করছিলেন লিটন মিয়া। বিশ্বকাপ উপলক্ষে পতাকা বিক্রি করতে তিনি ঢাকায় এসেছেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে। তিনি একা নন, একই এলাকার ছয়জন ঢাকায় এসেছেন। তাঁরা সবাই একে অপরের পরিচিত।
গতকাল দুপুরের দিকে ধানমন্ডির ৮/এ সড়কে কথা হয় লিটন মিয়ার সঙ্গে। তিন দিন আগে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছেন তিনি। রায়েরবাজারে তাঁর চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠেছেন। সকালে পতাকা নিয়ে বের হন, রাত ৯টা পর্যন্ত ধানমন্ডি, রায়েরবাজার, কলাবাগান এলাকায় পতাকা বিক্রি করেন। ফুটবল বিশ্বকাপ আর প্রতিবছর ডিসেম্বর মাস এলেই ঢাকায় আসেন তাঁরা কয়েকজন। কিছুদিন পতাকা বিক্রি করে আবার নিজের এলাকা মুকসুদপুরে ফিরে যান। বছরের বাকি সময় এলাকার বিভিন্ন বাজারে, অনুষ্ঠানে, মেলায় প্রসাধনী পণ্য বিক্রি করেন।
লিটন মিয়া বলেন, সারা বছর পতাকা ব্যবসা ভালো চলে না। ডিসেম্বর মাসে কিছু পতাকা বিক্রি হয়। আর বিশ্বকাপ খেলার সময় চলে।
লিটন মিয়া বলেন, ‘২০১৮ সালের বিশ্বকাপ থেকে ঢাকায় পতাকা বেচি। বিশ্বকাপের শুরুর কয়েক দিন আগে থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবসা ভালো হয়। তারপর আর কেউ পতাকা কেনে না। তখন বাইত চইল্যা যাই। এলাকায় কিছু জমিজমা আছে, সেগুলো চাষবাস করি। ফাঁকে–ফাঁকে সিজন আইলে পতাকা বেচি, বাকি সময় কসমেটিকস বেচি।’
এবার বিক্রি কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে লিটন মিয়া বলেন, ‘বিক্রি মোটামুটি। গত তিন দিনে চার–পাঁচ হাজার টাকার পতাকা বেচেছি। দিনে এক থেকে দেড় হাজার টাকার মতো লাভ হয়।’
কোন দেশের পতাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে জানতে চাইলে লিটন মিয়া বলেন, দিনে গড়ে ৩৫০–৪০০ পতাকা বিক্রি করেন। এর মধ্যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। বড় পতাকার পাশাপাশি ছোট পতাকা, মাথার ব্যান্ডও বিক্রি হচ্ছে; কিন্তু পতাকার তুলনায় কম।
গতকাল বিকেলে নিউমার্কেট এলাকায় দেখা হয় আরেকজন পতাকা বিক্রেতা মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সঙ্গে। তিনিও গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন। মুকসুদপুর থেকে আসা পতাকা বিক্রেতা লিটন মিয়াকে চেনেন কি না জিজ্ঞাসা করতেই বলেন, তাঁরা একসঙ্গেই ঢাকায় এসেছেন।
বড় দলগুলো যত দিন বিশ্বকাপের মঞ্চে থাকে, তত দিন ভালো বিক্রি হয় জানিয়ে লিটন মিয়া বলেন, ‘আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল যত দিন পর্যন্ত বিশ্বকাপের মাঠে থাকবে, তত দিন পর্যন্ত বেচাকেনা চলব। এরা হুইয়া পড়লে, বেচাকেনাও হুইয়া পড়ব, শ্যাষ। আরও ১০-১৫ দিন ব্যবসা ভালো চলব। সব মিইল্যা এক মাস ঢাকায় থাকুম, এই চিন্তা কইর্যা বাড়ি থেকে আইছি।’
বাড়তি আয়ের আশায়...
টিএসসি চত্বরে পতাকা বিক্রি করছেন একটি ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করা মনির হোসেন। পতাকার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পতাকার রঙে তৈরি চাবির রিং, মাস্ক, ব্যান্ড ও স্টিকার বিক্রি করেন তিনি।
মনির হোসেন বলেন, এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে মাসে আট হাজার টাকা বেতন পান। তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই বাড়তি কিছু উপার্জনের আশায় ভ্রাম্যমাণ দোকান দিয়েছেন। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের পতাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে। পতাকা বিক্রির ব্যবসা মন্দ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, গত সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছেন তিনি।