বিএনপির নতুন সরকারের মন্ত্রী হিসেবে আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন (এ জেড এম জাহিদ হোসেন) দায়িত্ব পেয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ফারজানা শারমীন। একই সঙ্গে জাহিদ হোসেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং ফারজানা শারমীন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সবশেষ একজন পুরুষকে দেখা গিয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার (সদ্য বিদায়ী) গঠনের পর। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ৯ দিন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে ২০০৬ সালে এই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন একজন পুরুষ। তাঁর নাম আলমগীর কবির। তাঁর আগে এই মন্ত্রণালয়ে একাধিক পুরুষ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ১৯৮৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১ জন পুরুষ এই মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার দায়িত্বে এসেছেন।
মন্ত্রণালয়ের ইতিবৃত্ত
মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে নির্যাতনের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করা হয়। ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ১৯৭৪’ পাস হয়। এর মাধ্যমে এই বোর্ডকে বাংলাদেশ নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করা হয়। ১৯৮৪ সালে সমাজকল্যাণ ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। ১৯৯৪ সালের ৫ মে মন্ত্রণালয়ের নামকরণ করা হয় ‘মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়’।
সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে (গত জানুয়ারি) প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়’ করার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৮৪ সালের আগে মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় ছিল না। তবে মন্ত্রণালয় গঠনের আগে সরকারের যাঁরা নারী বিষয়ে গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁদের নাম এখানকার কার্যকাল বোর্ডে রাখা হয়েছে।
এই হিসাবে ১৯৭৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে ৩৪ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী দায়িত্বে এসেছেন।
কে কবে কোন দায়িত্বে
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ফিরোজা বারী ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী হিসেবে নারীবিষয়ক কাজের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পরে আমিনা রহমান মন্ত্রী হিসেবে এবং তছলিমা আবেদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮২ সালে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কামরুন্নাহার জাফর দায়িত্বে আসেন। একই বছর মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আসেন শাফিয়া খাতুন।
রাবিয়া ভূঞা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আসেন ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৭ সালের ১৭ আগস্ট প্রথম কোনো পুরুষ মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তাঁর নাম মেজর জেনারেল (অব.) এম শামসুল হক।
১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনজন পুরুষ, একজন নারী । যথাক্রমে তাঁরা হলেন মির্জা রুহুল আমিন (মন্ত্রী), রেজওয়ানুল হক চৌধুরী (মন্ত্রী), টি এম গিয়াসউদ্দিন আহমেদ (প্রতিমন্ত্রী) ও সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ (মন্ত্রী)।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ১৫ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন আলমগীর এম এ কবির।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন তরিকুল ইসলাম। তিনি ৬ মাস এই মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। তাঁর পরে মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়ে আসেন বেগম সারওয়ারী রহমান।
১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে ৩ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন নাজমা চৌধুরী। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে প্রথমে আসেন মোজাম্মেল হোসেন, পরে জিন্নাতুন নেসা তালুকদার।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে এই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন রোকিয়া আফজাল রহমান। ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে জোট সরকার গঠিত হয়। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় বোন খুরশীদ জাহান হক। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির মেয়াদের শেষ দিকে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন মো. বরকতউল্লাহ বুলু। তাঁর ও খুরশীদ জাহান হকের মেয়াদকাল নিয়ে মন্ত্রণালয়ের বোর্ডে তথ্যগত কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। এ বিষয়ে বরকতউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, সেই সরকারের মেয়াদের শেষের ছয় মাস তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, কিন্তু সময় দিতে পারেননি। একই সময়ে তিনি প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় বাণিজ্য উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি
আর বিএনপির সেই মেয়াদের শেষ দিকে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন আলমগীর কবির।
২০০৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত (রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার) মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ছিলেন ইয়াসমিন মুর্শেদ।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১২ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদ নতুন প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকারে প্রথমে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী, পরে রাশেদা কে চৌধূরী।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। প্রথমে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হলে প্রথমে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন মেহের আফরোজ চুমকি, পরে আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টির সালমা ইসলাম।
২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন যথাক্রমে মেহের আফরোজ চুমকি, ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা ও সিমিন হোসেন (রিমি)।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অর্ন্তবর্তী সরকার গঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টা হন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ৯ দিন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। পরে এই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পান শারমীন এস মুরশিদ।
শারমীন এস মুরশিদ তাঁর শেষ কর্মদিবসে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘অনেক কাজ সম্পন্ন করেছি, বলা যাবে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করতে পেরেছি। কিছু কাজ শুরু করে দিতে পেরেছি। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য কুইক রেসপন্স টিম গঠনে কোর ম্যানেজমেন্ট টিম করা হয়েছে। কিছু অনিয়মের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। জাহিদ হোসেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান ফারজানা শারমীন। গত বুধবার তাঁরা মন্ত্রণালয়ে আসেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন।
মতবিনিময় সভায় জাহিদ হোসেন বলেন, ‘জনগণ আমাদের যে ক্ষমতা দিয়েছে, সে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই। এ জন্য দলীয়করণের ঊর্ধ্বে থেকে এ মন্ত্রণালয়ের উন্নয়নে সকলের সহযোগিতা চাই।’
নারী উন্নয়নের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার এই মন্ত্রণালয়ে আমরা একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী পেলাম। এটা ভালো হলো। এটা নারী উন্নয়নে সহায়ক হবে। আমাদের প্রত্যাশা, তাঁরা নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কাজ করবেন, নারীর দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করবেন, যাতে অর্থনীতি–রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে।’