
ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি বলেন, ইরানকে একেবারে ধ্বংস করে নতজানু হতে বাধ্য করতে বিদেশি শক্তি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সরকারের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী যদি তাদের প্রতিরোধ না করত, তবে দেশে বিপর্যয় ঘটে যেত।
গত বছরের জুনে ১২ দিনের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মতো এবারও ইরান জয়ী হয়েছে বলে দাবি করেন রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি।
আজ সোমবার সকালে ঢাকায় ইরান দূতাবাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে এ কথা বলেন রাষ্ট্রদূত। ইরানের চলমান পরিস্থিতির নিয়ে ইরান দূতাবাস কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে এ মতবিনিময়ের আয়োজন করে।
রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জানান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের জনগণের কষ্ট হচ্ছিল। গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে। প্রথম তিন দিন আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল। ৭ জানুয়ারির পর পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
আন্দোলনকারীদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিরোধের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, শুরুতে পুলিশ বিক্ষুব্ধ লোকজনকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিহত করতে থাকে। জানুয়ারির ৭ তারিখ থেকে পুরোপুরি সহিংস রূপ নেয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। হাসপাতাল, দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালান আন্দোলনকারীরা। তাঁরা দোকানিদের বের করে আন্দোলনে যোগ দিতে বলেন। হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালান। ৮ তারিখের পর অস্ত্রধারীরা যখন আন্দোলনকারীদের মধ্যে মিশে যায়, তখন পুলিশ সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। প্রতিটি রাস্তা সহিংস যুদ্ধে রূপ নেয়। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী যদি প্রতিরোধ না করত, তবে দেশে বিপর্যয় ঘটে যেত।
ইরানের সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ করেন রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহনাবাদি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে আন্দোলনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিল, সে ব্যাপারে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আছে। ট্রাম্প শুধু টুইট করেননি, তাঁরা রীতিমতো আন্দোলনে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী টুইট করেন।
ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, এর আগে গত বছরের জুনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান জয়ী হয়। সে জন্য ইসরায়েল এবার জড়িয়ে পড়ে। ১২ দিনের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ইরানকে পর্যুদস্ত করা, ইরানকে মাথা নত করতে বাধ্য করা।
জলিল রহিমি বলেন, এবারের আন্দোলনে সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঢুকে যায়। তাদের গুলিতে অনেক মানুষ মারা যায়। প্রাণ হারায় অনেক পুলিশ। এত অস্ত্র ইরানে কীভাবে ঢুকে পড়ল, সে প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানের সঙ্গে আফগানিস্তান, ইরাক, তুর্কমেনিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকে বহু বছর যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান করেছে। ইরানের প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র ঢুকে পড়া, প্রশিক্ষণ নেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। আর এটা হুট করে ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।
এভাবে সীমান্তবর্তী দেশ থেকে অস্ত্র ঢুকে পড়া গোয়েন্দাব্যর্থতা কি না, সে প্রশ্নের জবাবে জলিল রহিমি জাহনাবাদি পাল্টা প্রশ্নে সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, যদি বাংলাদেশে সশস্ত্র লোকজন এমন করত, তাহলে সরকার কী করত? ১০০ জন পুলিশকে হত্যা করেছে। অনেককে গলা কেটে টুকরা টুকরা করেছে। এটা কি স্বাভাবিক ঘটনা? শান্তিপূর্ণ আন্দোলন মানে স্লোগান হয়। কিন্তু সেটা সহিংসতায় রূপ নিলে কোনো সরকার চুপ করে বসে থাকতে পারে না।
ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এটা স্বীকার করতে হবে যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে খুব বেশি ভালো নেই। এটাই তারা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল অর্থনৈতিক কারণে। আমার আপনাদের কাছে প্রশ্ন, ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ কেন?’
ইরানের কাছে পরমাণু অস্ত্র নেই উল্লেখ করে ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ইরান পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য চায়। যুক্তরাষ্ট্র আসলে ইরানের তেল–গ্যাস চায়। এটা দিলে তখন আর কোনো মানবাধিকারের কথা আসবে না। সে মনে করেছিল, ইরানকে ধ্বংস করতে পারবে। ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে বললে ছেড়ে যাবে। আমাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচিতে হামলা করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আমাদের পারমাণবিক কাঠামো ধ্বংস করার দাবি করে। পরে আবার তারা বলল, ধ্বংস হয়নি।’
রহিমি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ চায়নি, যুদ্ধ হোক। তবে ইরান আক্রান্ত হলে এ অঞ্চলে যত মার্কিন ঘাঁটি আছে, ইরান সেখানে আক্রমণ করবে।
ইরানজুড়ে স্টারলিংকের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন দেশটির রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বিক্ষুব্ধ মানুষগুলোকে পুঁজি করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে ইরানজুড়ে সহিংসতা করানো হয়েছে। সে কারণেই ইরানে এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ইরানের রাষ্ট্রদূত অভিযোগ করেন, ইরানে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা প্রথমেই পুলিশকে আক্রমণ করে। তারপরে সেটিকে পুঁজি করে পশ্চিমারা। আর পুরোটাই করা হয়েছে মার্কিনদের সুচারু বুদ্ধিমত্তা আর পরামর্শের মাধ্যমে।