ভোলা থেকে রূপান্তর করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বানিয়ে জাহাজে করে ঢাকায় আনতে চায় জ্বালানি বিভাগ
ভোলা থেকে রূপান্তর করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বানিয়ে জাহাজে করে ঢাকায় আনতে চায় জ্বালানি বিভাগ

এবার এলএনজি করে গ্যাস আনার চিন্তা

গ্যাসের সংকট সামলাতে পারছে না সরকার। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন টানা কমছে। চাইলেও বাড়তি আমদানি করা যাচ্ছে না, কেননা তেমন অবকাঠামো তৈরি নেই। এ পরিস্থিতিতে অলস পড়ে থাকা ভোলার গ্যাস ব্যবহারে সক্রিয় হয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

শিল্পের গ্যাস–সংকট পূরণের নামে বিগত সরকারের সময় ভোলার গ্যাস ঢাকায় আনার অনুমোদন পায় ইন্ট্রাকো। সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) হিসেবে সিলিন্ডারে ভরে ঢাকায় আনা শুরু হয় ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। দিনে আনার কথা ৫০ লাখ ঘনফুট, পরে এটি বাড়িয়ে আড়াই কোটি ঘনফুট করার কথা ছিল। তারা দিনে সর্বোচ্চ এনেছে ৮ থেকে ৯ লাখ ঘনফুট। এখন এটি আরও কমে আসছে।

এ অবস্থায় সিএনজি করে ঢাকায় গ্যাস আনার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় এখন নেওয়া হচ্ছে নতুন পরিকল্পনা। সে অনুযায়ী রূপান্তর করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বানিয়ে জাহাজে করে ঢাকায় আনতে চায় জ্বালানি বিভাগ।

বেসরকারি উদ্যোগে দিনে তিন কোটি ঘনফুট গ্যাস এনে শিল্পে সরবরাহের চিন্তা করা হচ্ছে। এ জন্য ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম নির্ধারণে গতকাল মঙ্গলবার শুনানি করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলটরি কমিশন (বিইআরসি)। কমিশন কার্যালয়ে এটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ৪৭ টাকা ৫০ পয়সা প্রস্তাব করা হয়েছে। ভোলা থেকে আনা সিএনজির দামও একই।

তবে এলএনজির দাম নির্ধারণ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, ভোলার গ্যাস স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার করতে তুলনামূলক কম দামে গ্যাস সরবরাহের কথা বলেছিল জ্বালানি বিভাগ। নতুন শিল্পকারখানায় সংযোগের ক্ষেত্রে এখন প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৪০ টাকা। ভোলায় শিল্প হলে এটি ৩০ টাকা করার কথা। এ দাম নির্ধারণ না করেই এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। অথচ ভোলায় বিনিয়োগ উৎসাহী করতে গত নভেম্বরে সরকারের তিনজন উপদেষ্টা ভোলা ঘুরে এসেছেন।

সরকারি অর্থায়নে ভোলায় একটি সার কারখানা করতে এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ভোলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিসিক, বড় উদ্যোক্তাদের নিয়ে শিল্পাঞ্চল ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) তৈরির কথা বলেছে সরকার। ভোলায় আরেক ব্যবসায়িক গোষ্ঠী শেল্‌টেকে্‌র সিরামিক কারখানা উৎপাদন শুরু করেছে ২০১৯ সালে। ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল। এর মধ্যে এলএনজি করে আনার এ প্রক্রিয়া ভোলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুনানিতে অংশ নিয়ে ভোলার গ্যাস এলএনজি করে আনার বিরোধিতা করেন অনেকে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদপ্তর) সৈয়দ জুলফিকার আলী বলেন, এলএনজি রূপান্তর ও পরিবহনে খরচ ধরা হয়েছে ২৯ টাকা ৯০ পয়সা। দিনে ৩ কোটি ঘনফুট করে আনা হলে বছরে খরচ হবে প্রায় ৯৩০ কোটি টাকা। ১০ বছরে খরচ হবে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। রাষ্ট্রের এই টাকা অপচয় না করে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হোক।

পিডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ১ ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ ঢাকায় আনতে ইউনিটে খরচ পড়বে ১ টাকা ২৪ পয়সা। এতে কোনো রকম বিনিয়োগ প্রয়োজন নেই।

শুনানিতে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভোলায় আরও গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে পাইপলাইন করা লাগবেই। সবার মতামত কমিশন বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।

পেট্রোবাংলার তথ্য বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় সর্বোচ্চ ২৭০ থেকে ২৭৫ কোটি ঘনফুট। ১০৫ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি আছে। অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দিয়ে কূপ খনন করা হচ্ছে। ভোলায় বর্তমানে দিনে উৎপাদন সক্ষমতা ১২ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে ৯ কোটি ঘনফুট। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে ভোলায়।