অভিমত

নরসিংদীর ভূমিকম্পকে কেন বোঝা জরুরি

নরসিংদীর ডেইরি ফার্ম এলাকায় ভূমিকম্পের কারণে মাটিতে ফাটলের সৃষ্টি হয়
ছবি: জিএসবি

নরসিংদীতে ভূ-অভ্যন্তরে যে শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করার মতো শক্তি জমা ছিল, সেটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বরের আগপর্যন্ত অজানাই ছিল। ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে নরসিংদীর মাধবদী উপজেলায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে সৃষ্ট ভূকম্পনটি নিয়ে আমাদের জানা-বোঝাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল।

ভূমিকম্পের সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করতে নতুন এ উৎসস্থলকে জানা জরুরি।
কারণ, ১০০ বছরের বেশি সময় পর বাংলাদেশে ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে এবং সেটির উৎসস্থল নরসিংদী। কারও কোনো ধারণা ছিল না যে এ অঞ্চল একটি উৎসস্থল হতে পারে। এ ভূমিকম্পের পর কয়েকটি আফটারশক (ভূমিকম্প-পরবর্তী কম্পন) ঢাকার বাসাবো পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

নরসিংদী একটা বার্তা দিয়ে গেল যে দেশে এ রকম ভূমিকম্প তৈরি করতে পারার মতো অনেক ফল্ট আছে এবং ভয়ের বিষয় হলো সেগুলো অচিহ্নিত। এটি পূর্বের মেগাথ্রাস্ট (বড় আকারের ফল্ট বা ভাঙনরেখা, যা বড় ভূমিকম্পের উৎস) হিসেবে পরিচিত চ্যুতিরেখার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এ মাত্রার ভূমিকম্পে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই।

ভূমিকম্প কখনো হঠাৎ আসে না। মাটির নিচে বছরের পর বছর, দশকের পর দশক শক্তি জমে। তারপর একদিন হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডে সবকিছু বদলে দেয়। নরসিংদীর কম্পন সেই অদৃশ্য জমে থাকা শক্তির একটি ছোট্ট ইঙ্গিত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—এই ভূমিকম্পের উৎস ফল্ট পূর্বে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল না। অর্থাৎ আমরা জানিই না আমাদের পায়ের নিচে কোথায় কী অপেক্ষা করছে। আমরা কি প্রস্তুত? আমাদের শহরগুলো কি নিরাপদ? ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প মোকাবিলায় রাষ্ট্রের পরিকল্পনা কতটা কার্যকর?

১৮ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ নরম মাটির বাংলাদেশে একটি ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অগণিত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, শত শত দালানকোঠা ধূলিসাৎ করে দিতে পারে নিমেষেই।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়। আমাদের ইতিহাসে ৭ মাত্রার ওপর কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৬২ সালের আরাকান ভূমিকম্প, ১৮৮৫ সালের বেঙ্গল ভূমিকম্প, ১৮৮৭ সালের শিলং ভূমিকম্প আর ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের পূর্বপুরুষেরা বড় কয়েকটি ভূমিকম্প দেখে গেছেন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প সেন্টারের ক্যাটালগ হিসেবে ১৯০০ ও ২০২৫ সময়ে বাংলাদেশ ও সংলগ্ন অঞ্চলে প্রায় ১৭ হাজার ৪৪৪টি ২ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।

শুধু ২০২৫ ও ২০২৬-এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ভেতরে ৩ মাত্রার অধিক ১৮টি ভূমিকম্প হয়েছে, যা গত ৫ বছরের তুলনায় সংখ্যায় আর মাত্রায় দ্বিগুণের বেশি। ১০০ বছরের বেশি সময়ে দেশের ভেতরে বড় কোনো ভূমিকম্প না থাকায় আমরা প্রায় এই দুর্যোগ সম্পর্কে ভুলতে বসেছিলাম, বেশির ভাগ মানুষের ধারণা ছিল, বাংলাদেশে ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কাই নেই। ঠিক এমন সময় গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প, সঙ্গে চারটি আফটারশক আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভূমিকম্পে নরসিংদীর পলাশের দড়িহাওলাপাড়ার বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের কাঁচা রাস্তায় সৃষ্ট ফাটল

১৮ কোটি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ নরম মাটির বাংলাদেশে একটি ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অগণিত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, শত শত দালানকোঠা ধূলিসাৎ করে দিতে পারে নিমেষেই। তাই অন্য ভূকম্পপ্রবণ দেশের মতো বাংলাদেশেও অবিলম্বে ভূমিকম্প গবেষণা ও ভূমিকম্প মোকাবিলার সব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

দেশে ভূমিকম্প বিষয়ে গবেষণা

অর্থ আর সদিচ্ছার অভাবে বাংলাদেশে ভূমিকম্প বিষয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে। দেশি অর্থ আর ব্যবস্থাপনায় এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা কাজ হয়নি। বাংলাদেশ সরকারের কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের আওতায় ২০১০-২০১৫ সময়ের দিকে দেশের কিছু অঞ্চলে পরিখা খনন করে প্যালিওসিসমোলজি (অতীতের ভূমিকম্পের প্রমাণ খুঁজে বের করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি) বিষয়ে কিছু কাজ করা হয়।

দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আরেকটি বড় মাপের ফল্ট খুঁজে পান, যা ১৮৮৫ সালের বগুড়া ভূমিকম্প এবং ১২ থেকে ১৬ শতকে করতোয়া নদী অববাহিকায় কয়েকটি বড় ভূমিকম্পের সঙ্গে এবং মহাস্থানগড় তথা প্রাচীন সভ্যতা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

এরপর যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় দেশে কিছু ভূমিকম্প মাপকযন্ত্র ও জিপিএস যন্ত্র বসানো হয়। তারা ২০১৬ সময়ে বাংলাদেশের ভূমিকম্প বিষয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। ওই প্রবন্ধে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার কাছ দিয়েই একটি মেগাথ্রাস্ট মাটির নিচে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে—এমন শক্তি জমে আছে। সেটি যেকোনো সময় আঘাত হানতে পারে।

এরপর আরও কয়েকটি গবেষকদল একই মত প্রকাশ করে আরও কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দল বাংলাদেশের গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকায় আড়াই হাজার বছর আগের বড় একটি ভূমিকম্পের চিহ্ন খুঁজে পান।

অন্যদিকে বাংলাদেশের একজন ভূমিকম্পবিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর গবেষণাকাজে দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আরেকটি বড় মাপের ফল্ট খুঁজে পান, যা ১৮৮৫ সালের বগুড়া ভূমিকম্প এবং ১২ থেকে ১৬ শতকে করতোয়া নদী অববাহিকায় কয়েকটি বড় ভূমিকম্পের সঙ্গে এবং মহাস্থানগড় তথা প্রাচীন সভ্যতা বিলীন হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এ ছাড়া কুমিল্লার ময়নামতি ও রানিকুটির ধ্বংসের সঙ্গেও প্রাচীন ভূমিকম্পের সংযোগ থাকার কথাও জানা যায়।

ফল্ট-এর সঙ্গে ভূমিকম্পের সম্পর্ক

ফল্ট হলো মাটির নিচে থাকা ফাটল বা চ্যুতি, যা প্রচণ্ড চাপের কারণে ভেঙে বা স্থানচ্যুতির কারণে সৃষ্টি হয়। মাটির নিচে এ রকম শত শত ফল্ট আছে। সব ফল্ট ভূমিকম্প সৃষ্টি করে না, কেবল যেসব ফল্টে শক্তি জমে আছে, সেগুলোতেই ভূমিকম্প হয়।

ফল্টের মধ্যে আছে মেগাথ্রাস্ট ফল্ট, ডাউকি ফল্ট আর মধুপুর ফল্ট। তবে নতুন গবেষণা বলছে, এ ফল্টগুলো ছাড়াও পাবনা-বগুড়া-জামালপুর-শেরপুর-নেত্রকোনা এলাকায় বেশ বড় আকারের আরেকটি সক্রিয় ফল্ট আছে, যা অচিরেই একটি ৬ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে।

নরসিংদী এলাকায় সম্ভাব্য একটি ফল্ট আছে, যা বৃহত্তর ঢাকার অনেক এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, নরসিংদীর ভূমিকম্প মেগাথ্রাস্ট ফল্ট, ডাউকি ফল্ট বা মধুপুর ফল্ট থেকে হয়নি। কাজেই ভবিষ্যতে ভূমিকম্প কোথায় হতে পারে, এ বিষয়ে কেউ শক্তপোক্তভাবে বলতে পারছেন না। ঢাকা শহরের জন্য এই উৎস দ্বারা সৃষ্ট ভূমিকম্প মারাত্মক বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে—এমন সংশয় আছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।

ভূমিকম্প গবেষণা ও আগাম বার্তা

বর্তমানে ভূমিকম্প গবেষণা অনেক উন্নত হয়েছে। আগাম ভূমিকম্প বিষয়ে দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও ১০-২০ বছরের একটা ধারণা দেওয়া যায়। জাপান, ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল সফলতার সঙ্গে এই আগাম বার্তা কাজে লাগিয়ে আসছে গত এক দশক ধরে। তবে গবেষণাকাজটি খুবই সংবেদনশীল, এ জন্য নিখুঁতভাবে করতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, ইউরোপ, নিউজিল্যান্ড এমনকি নেপালেও কোন কোন ফল্ট ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প করতে পারে, কোথায় করতে পারে, কত মাত্রায় করতে পারে এবং কখন করতে পারে—সেসব হিসাব বের করে রেখেছে এবং তারা এ কাজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও হালনাগাদ করে। এ কাজে উন্নত পৃথিবীতে প্যালিওসিসমোলজি আর জিপিএস সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে গবেষণায় এসেছে।

দেশে ভূমিকম্প গবেষণায় কী চাই

বাংলাদেশে ভূমিকম্প বিষয়ে ভালোভাবে জানে—এমন বিশেষজ্ঞের সংখ্যা তেমন বেশি নয়। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ভূতত্ত্ববিদ বিদেশে গিয়ে ভূমিকম্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। আধুনিক যন্ত্র সরবরাহ করা হলে তারা এ বিষয়ে আরও গভীর আর নির্ভুল গবেষণাকাজ পরিচালনা করতে আগ্রহী।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশনগুলোতে জরুরি হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্টেশনগুলোতে উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আসনসংখ্যা বাড়াতে হবে হাসপাতালগুলোতে।

প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে যাচাই করার জন্য। ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প বিষয়ে জানতে আর ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বাংলাদেশে সিসমোগ্রাফ, জিপিএস ও জিএনএসএস স্টেশন স্থাপন করে প্যালিওসিসমোলজি গবেষণা শুরু করা দরকার। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, দেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশে ভূমিকম্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষারত ভূতত্ত্ববিদেরা এ বিষয়ে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে পারেন। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যত দেরি হবে, তত বেশি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ব আমরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা

রাজধানীর আশপাশের এলাকাগুলোতে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজ কিছুটা সহজ হলেও ঢাকা বা বিভাগীয় সদরে অনেকটা অসম্ভব হয়ে যাবে। যেহেতু উদ্ধার করার মতো রাস্তা নেই, একমাত্র হেলিকপ্টার দিয়ে দ্রুত উদ্ধার অভিযান নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য উচ্চ ঝুঁকি এলাকা চিহ্নিত করে সেই এলাকাগুলোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনগুলোতে জরুরি হেলিকপ্টার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্টেশনগুলোতে উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আসনসংখ্যা বাড়াতে হবে হাসপাতালগুলোতে। প্রতিটি স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং এলাকা ও মহল্লায় প্রতি তিন মাস পরপর ভূমিকম্প ও আগুনের মহড়া চালানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

* আক্তারুল আহসান: ভূমিকম্প গবেষক, উপপরিচালক, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর।