বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডের (বিআইএফএফএল) সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) মারধর, প্রাণনাশের হুমকি ও জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
আজ সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. সজিবুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি দাবি করেন, মামলাটির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। অধিকাংশ ধারায় জামিনযোগ্য হওয়ায় আদালত তাঁর জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন।
২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন বিআইএফএফএলের সাবেক সিইও এস এম ফরমানুল ইসলাম। আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দায়িত্ব দেন। মামলায় সালমান এফ রহমান ছাড়াও সাবেক অর্থসচিব ও সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, এই মামলার তদন্তে প্রাপ্ত ৬ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি আব্দুর রউফ তালুকদার, আবু হেনা মো. রহমতুল মুনিম, বিআইএফএফএল এর সাবেক কোম্পানি সচিব মো. মনিরুল ইসলাম খান ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আগেই জামিন পেয়েছেন। সর্বশেষ আজ সালমান এফ রহমান জামিন পেলেন। মামলার অপর আসামি বিমান বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব সাজ্জাদুল হাসান এখনো পলাতক আছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদ রানা ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারসহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর আগে ১৭ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।
মামলার এজাহারে বলা হয়, বিআইএফএফএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) থাকাকালে এস এম ফরমানুল ইসলামকে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিপুল অঙ্কের ঋণ ও বিনিয়োগ–সুবিধা দিতে অনৈতিক চাপ দেওয়া হয়। বিশেষ করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন ‘তিস্তা সোলার’ প্রকল্পের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রায় ১৮৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা) ঋণ ছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় ফরমানুল ইসলাম এতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর তাঁর ওপর চাপ আরও বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে সালমান এফ রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ২০০ কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ডে আগাম বিনিয়োগ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো প্রকার জামানত ছাড়াই শতকোটি টাকার ঋণ ছাড়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তবে সিআইবির প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত জটিলতা থাকায় সেই প্রস্তাবেও সম্মতি দেননি ফরমানুল ইসলাম।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই বিআইএফএফএলের ৮০তম পর্ষদ সভায় ফরমানুল ইসলামের ওপর চড়াও হন আসামিরা। একপর্যায়ে তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করা হয়। পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক তাঁর কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর দাপ্তরিক মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন, প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহারে বাধা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ির চাবি কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি তাঁকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়।
জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মারধর, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের এসব অভিযোগ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পিবিআই। আদালত অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। আসামিরা আদালতে হাজির না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর মামলার ৩ নম্বর আসামি মনিরুল ইসলাম খান ও ৫ নম্বর আসামি খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন। পরে গত বৃহস্পতিবার আরও দুজন জামিন পান।
মামলার বাদী এস এম ফরমানুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে পিবিআই দণ্ডবিধির যেসব ধারায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছে সেগুলো জামিনযোগ্য। তাই জামিন পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, অভিযুক্ত আসামিরা বিগত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারি দলের নেতৃস্থানীয় উকিলরা তাঁদের হয়ে মামলা পরিচালনা করছেন। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও নির্বিকার ভাব নিয়ে বসে আছে। এতকাল সবাই জানত আব্দুর রউফ তালুকদার, আবু হেনা মো. রহমতুল মুনিমেরা জুলাই–পরবর্তী সময়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এই মামলায় হাজির হয়ে প্রমাণ করলেন, তাঁরা দেশেই ছিলেন।